ভিখিরি
শহিদুল ইসলাম আকাশ
প্রকৃতি বিস্ময় পছন্দ করে। পছন্দ হোক-বা না-হোক মানুষকেও তাঁর এক জীবনে অসংখ্যবার বিস্ময়ের মুখোমুখি হতে হয়।
একদিনের ঘটনা। মোটরবাইক চালিয়ে কর্মস্থল থেকে বাসায় ফিরছি। দেখি আমার সামনেই বেশ বিলাসবহুল একটা কার এসে থামলো। হঠাৎ কী হয়, পেছনের আসন থেকে বেশ মোটাসোটা এক ব্যক্তি নামলেন, নেমেই দ্রুতগতিতে একই গাড়ির সামনে গিয়ে দরজা খুলে চালকের আসনে বসা মানুষটিকে রীতিমত টেনেবুনে বের করে, চালককে কিছু বুঝার বা বলার সময়ও দিলেন না, চালকের গালে সজোরে চড় লাগিয়ে দিলেন। চালক নির্বিকার, মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েই আছেন। ওই ব্যক্তি অকথ্য ভাষায় চালকটাকে গালিগালাজ করেই যাচ্ছেন।
ঘটনার আকস্মিকতায় কখন আমি আমার বাইক থামালাম, মনেই ছিলো না। ছুটে গেলাম সামনে।
ঘটনা কী, জানতে চাইলাম।
মোটাসোটা ওই লোক, আমার দিকেও তেড়ে আসার উপক্রম করলেন, বললেন, 'পঁয়ত্রিশ লাখ টাকা দিয়ে এই গাড়ি কিনেছি। ব্যাটা ড্রাইভার গাছের সাথে লাগিয়ে দিলো গাড়িটাকে। সামনের একটা লাইট বলতে গেলে পুরোপুরিই নষ্ট হয়ে গেলো।'
এরপর আমার মুখের উপর আঙুল নেড়ে নেড়ে বলতে লাগলেন, 'পঁয়ত্রিশ লাখ টাকা মানে কতো টাকা জানেন!'
বললাম, 'জানবো না কেন? পঁয়ত্রিশ লাখ টাকা মানে পঁয়ত্রিশ লাখ টাকাই__সোজা অংক।'
তিনি আগের চেয়েও অধিক রাগান্বিত হয়ে বললেন, 'ঠাট্টা করছেন কেন! ঠাট্টা করার মতো ব্যাপার না মোটেও। চালাচ্ছেন তো দেখি ভাঙাচোরা মোটরসাইকেল, আপনি বুঝবেন কি আমার গাড়ির কী মূল্য।'
আমাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে তিনি পুনরায় চালকের দিকে ফিরে বললেন, 'ওই ব্যাটা, তোর চৌদ্দগুষ্ঠির সব বিক্রি করলেও কি এই লাইটের দাম দিতে পারবি? এখন কী করবি বল?'
চালকের অনুনয়, 'বিশ্বাস করেন আমি ইচ্ছে করে গাছের সাথে গাড়ি লাগাইনি, আপনি নিজেও তো দেখেছেন, গাছের সাথে না-লাগালে স্কুলফেরত বাচ্চামেয়েটার কিছু একটা হয়েই যেতো।'
'হলে হতো, আমার কী?' ওই ব্যক্তির উত্তেজিত প্রশ্ন।
তিনি আবার আমার দিকে ফিরলেন, আমাকে তখনো ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললেন, 'আপনার সমস্যা কী বলুন তো? এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী দেখছেন?'
বললাম, 'আপনার সমস্যা কী? গাড়িটা আপনার, রাস্তাটা তো আর আপনার না। সামান্য একটা গাড়ির লাইটের জন্য আপনার কান্নাকাটি দেখে আমি খুব অবাক হলাম। সমাজের চোখে আপনারা হয়তো অনেক বড়লোক। কিন্তু একটি অসহায় বাচ্চামেয়েকে বাঁচাতে গিয়ে চালক অনিচ্ছাকৃত গাড়ির একটা লাইট নষ্ট করাতে যিনি সেই চালককে অকথ্য ভাষায় গালাগালি এমনকি তাঁর গায়ে হাতও তুলে ফেলেন__তখন বুঝতে কষ্ট হয় না যে, এই বড়লোকির আড়ালে কতোটা ছোটলোক আপনারা।'
বলেই, পাশ ফিরে আমার মোটরবাইকের সামনে চলে এলাম। চালকের করুণ মুখাবয়ব মনে হতেই আবারও ওদিকেই এগোলাম। চালকের উদ্দেশে বললাম, 'ভাই, আপনার মালিক কি গাড়ি চালাতে জানেন?'
হঠাৎ আমার এমন কথায় মালিক যতোটা না বিস্মিত হলেন, তারচেয়ে অধিক বিস্ময় নিয়ে আমার দিকে তাকালেন ওই চালক, বললেন, 'না, তিনি গাড়ি ড্রাইভ করতে পারেন না।'
মালিকের দিকে তাকিয়েই চালককে বললাম, 'আপনার উচিত এই মুহূর্তে আপনার মালিককে এই মাঝরাস্তাতেই চাবিটা বুঝিয়ে দিয়ে বলা যে, এই মুহূর্ত থেকেই আপনি আর তাঁর চাকরি করবেন না। তাহলেই হয়তো ওনার পঁয়ত্রিশ লাখ টাকার গাড়ি ঠ্যালাগাড়ির মতো ঠ্যালানি দিয়েই নিয়ে যেতে হবে তাঁকে।'
বলেই আমি আমার মোটরবাইক নিয়ে ওখান থেকে চলে আসলাম দ্রুত।
এই ঘটনার তিন মাস পরের কথা। আমার জন্য যে এক বিস্ময়কর মুহূর্ত অপেক্ষা করে আছে, তা জেনে আমার বিস্ময়েরও অন্ত রইলো না।
একদিন ভোরবেলা সেই চালক আমার বাসায় এসে হাজির। তাঁর চেহারা আমার স্মরণে ছিলো না, পরিচয় দিতে বলার পর তিনি যখন সেদিনের সেই ঘটনা উল্লেখ করলেন__তখনই চিনতে পারলাম তাঁকে। বললেন, অনেক কষ্ট করে তিনি আমার ঠিকানা জোগাড় করেছেন।
আমার বাসায় তাঁর এই হঠাৎ উপস্থিতির কারণ জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, 'সেদিন আপনার কথামতোই গাড়ির চাবিটা মালিককে দিয়ে বলেছি, এখন থেকে আমি আর চাকরি করবো না। এক মাসের বেতন পাওনা ছিলো আমার, বললাম, সেই টাকাটা দিয়ে যেটুকু সম্ভব গাড়ির লাইটটা মেরামত করে নিতে।'
সেই চালক এখন নতুন চাকরি করছেন, এই মালিক আগের মালিকের মতো এতো হৃদয়হীন নয়__নতুন মালিকের নানা মহানুভবতার কথা তিনি যখন বলছিলেন, তখন আমি শুধুই এক মনোযোগী শ্রোতা।
যাওয়ার সময় তিনি বললেন, 'সেদিন যখন আমি হঠাৎ তাঁর মুখের উপর চাবিটা দিয়ে চলে আসছিলাম, আসতে আসতে একবার পিছু ফিরে তাঁকে দেখলাম। তখন এই পঁয়ত্রিশ লাখ টাকার গাড়ির মালিককেই মনে হচ্ছিলো যেন কোনো ভিখিরি। যেন তখনই তিনি করুণ সুরে বলতে চাইছেন, 'আমাকে অন্তত একটু বাসা পর্যন্ত হলেও দিয়ে আসো, ভাই।''
প্রকৃতি বিস্ময় পছন্দ করে। পছন্দ হোক-বা না-হোক মানুষকেও তাঁর এক জীবনে অসংখ্যবার বিস্ময়ের মুখোমুখি হতে হয়।
একদিনের ঘটনা। মোটরবাইক চালিয়ে কর্মস্থল থেকে বাসায় ফিরছি। দেখি আমার সামনেই বেশ বিলাসবহুল একটা কার এসে থামলো। হঠাৎ কী হয়, পেছনের আসন থেকে বেশ মোটাসোটা এক ব্যক্তি নামলেন, নেমেই দ্রুতগতিতে একই গাড়ির সামনে গিয়ে দরজা খুলে চালকের আসনে বসা মানুষটিকে রীতিমত টেনেবুনে বের করে, চালককে কিছু বুঝার বা বলার সময়ও দিলেন না, চালকের গালে সজোরে চড় লাগিয়ে দিলেন। চালক নির্বিকার, মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েই আছেন। ওই ব্যক্তি অকথ্য ভাষায় চালকটাকে গালিগালাজ করেই যাচ্ছেন।
ঘটনার আকস্মিকতায় কখন আমি আমার বাইক থামালাম, মনেই ছিলো না। ছুটে গেলাম সামনে।
ঘটনা কী, জানতে চাইলাম।
মোটাসোটা ওই লোক, আমার দিকেও তেড়ে আসার উপক্রম করলেন, বললেন, 'পঁয়ত্রিশ লাখ টাকা দিয়ে এই গাড়ি কিনেছি। ব্যাটা ড্রাইভার গাছের সাথে লাগিয়ে দিলো গাড়িটাকে। সামনের একটা লাইট বলতে গেলে পুরোপুরিই নষ্ট হয়ে গেলো।'
এরপর আমার মুখের উপর আঙুল নেড়ে নেড়ে বলতে লাগলেন, 'পঁয়ত্রিশ লাখ টাকা মানে কতো টাকা জানেন!'
বললাম, 'জানবো না কেন? পঁয়ত্রিশ লাখ টাকা মানে পঁয়ত্রিশ লাখ টাকাই__সোজা অংক।'
তিনি আগের চেয়েও অধিক রাগান্বিত হয়ে বললেন, 'ঠাট্টা করছেন কেন! ঠাট্টা করার মতো ব্যাপার না মোটেও। চালাচ্ছেন তো দেখি ভাঙাচোরা মোটরসাইকেল, আপনি বুঝবেন কি আমার গাড়ির কী মূল্য।'
আমাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে তিনি পুনরায় চালকের দিকে ফিরে বললেন, 'ওই ব্যাটা, তোর চৌদ্দগুষ্ঠির সব বিক্রি করলেও কি এই লাইটের দাম দিতে পারবি? এখন কী করবি বল?'
চালকের অনুনয়, 'বিশ্বাস করেন আমি ইচ্ছে করে গাছের সাথে গাড়ি লাগাইনি, আপনি নিজেও তো দেখেছেন, গাছের সাথে না-লাগালে স্কুলফেরত বাচ্চামেয়েটার কিছু একটা হয়েই যেতো।'
'হলে হতো, আমার কী?' ওই ব্যক্তির উত্তেজিত প্রশ্ন।
তিনি আবার আমার দিকে ফিরলেন, আমাকে তখনো ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললেন, 'আপনার সমস্যা কী বলুন তো? এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী দেখছেন?'
বললাম, 'আপনার সমস্যা কী? গাড়িটা আপনার, রাস্তাটা তো আর আপনার না। সামান্য একটা গাড়ির লাইটের জন্য আপনার কান্নাকাটি দেখে আমি খুব অবাক হলাম। সমাজের চোখে আপনারা হয়তো অনেক বড়লোক। কিন্তু একটি অসহায় বাচ্চামেয়েকে বাঁচাতে গিয়ে চালক অনিচ্ছাকৃত গাড়ির একটা লাইট নষ্ট করাতে যিনি সেই চালককে অকথ্য ভাষায় গালাগালি এমনকি তাঁর গায়ে হাতও তুলে ফেলেন__তখন বুঝতে কষ্ট হয় না যে, এই বড়লোকির আড়ালে কতোটা ছোটলোক আপনারা।'
বলেই, পাশ ফিরে আমার মোটরবাইকের সামনে চলে এলাম। চালকের করুণ মুখাবয়ব মনে হতেই আবারও ওদিকেই এগোলাম। চালকের উদ্দেশে বললাম, 'ভাই, আপনার মালিক কি গাড়ি চালাতে জানেন?'
হঠাৎ আমার এমন কথায় মালিক যতোটা না বিস্মিত হলেন, তারচেয়ে অধিক বিস্ময় নিয়ে আমার দিকে তাকালেন ওই চালক, বললেন, 'না, তিনি গাড়ি ড্রাইভ করতে পারেন না।'
মালিকের দিকে তাকিয়েই চালককে বললাম, 'আপনার উচিত এই মুহূর্তে আপনার মালিককে এই মাঝরাস্তাতেই চাবিটা বুঝিয়ে দিয়ে বলা যে, এই মুহূর্ত থেকেই আপনি আর তাঁর চাকরি করবেন না। তাহলেই হয়তো ওনার পঁয়ত্রিশ লাখ টাকার গাড়ি ঠ্যালাগাড়ির মতো ঠ্যালানি দিয়েই নিয়ে যেতে হবে তাঁকে।'
বলেই আমি আমার মোটরবাইক নিয়ে ওখান থেকে চলে আসলাম দ্রুত।
এই ঘটনার তিন মাস পরের কথা। আমার জন্য যে এক বিস্ময়কর মুহূর্ত অপেক্ষা করে আছে, তা জেনে আমার বিস্ময়েরও অন্ত রইলো না।
একদিন ভোরবেলা সেই চালক আমার বাসায় এসে হাজির। তাঁর চেহারা আমার স্মরণে ছিলো না, পরিচয় দিতে বলার পর তিনি যখন সেদিনের সেই ঘটনা উল্লেখ করলেন__তখনই চিনতে পারলাম তাঁকে। বললেন, অনেক কষ্ট করে তিনি আমার ঠিকানা জোগাড় করেছেন।
আমার বাসায় তাঁর এই হঠাৎ উপস্থিতির কারণ জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, 'সেদিন আপনার কথামতোই গাড়ির চাবিটা মালিককে দিয়ে বলেছি, এখন থেকে আমি আর চাকরি করবো না। এক মাসের বেতন পাওনা ছিলো আমার, বললাম, সেই টাকাটা দিয়ে যেটুকু সম্ভব গাড়ির লাইটটা মেরামত করে নিতে।'
সেই চালক এখন নতুন চাকরি করছেন, এই মালিক আগের মালিকের মতো এতো হৃদয়হীন নয়__নতুন মালিকের নানা মহানুভবতার কথা তিনি যখন বলছিলেন, তখন আমি শুধুই এক মনোযোগী শ্রোতা।
যাওয়ার সময় তিনি বললেন, 'সেদিন যখন আমি হঠাৎ তাঁর মুখের উপর চাবিটা দিয়ে চলে আসছিলাম, আসতে আসতে একবার পিছু ফিরে তাঁকে দেখলাম। তখন এই পঁয়ত্রিশ লাখ টাকার গাড়ির মালিককেই মনে হচ্ছিলো যেন কোনো ভিখিরি। যেন তখনই তিনি করুণ সুরে বলতে চাইছেন, 'আমাকে অন্তত একটু বাসা পর্যন্ত হলেও দিয়ে আসো, ভাই।''

Comments
Post a Comment