অন্তর্যামী

শহিদুল ইসলাম আকাশ


আমি সুমন ছেলেটাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছি। যাতে আসল সত্যটা কোনো না কোনোভাবে বেরিয়ে আসে। বললাম, 'আমি আট বছর ধরে জনপ্রতিনিধিত্ব করছি। মানুষের চোখ দেখে এখন আমি মন পড়তে পারি।' আমার কথায় সুমন বিভ্রান্ত হলো।

ত্রিশের মতো বয়স সুমনের। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গুরুতর। সকালবেলা সুমনের বউ এসে কেঁদেকেটে বলে গেছে, স্বামী সুমন আজ তার গায়ে হাত তুলেছে। চড়থাপ্পড় দিয়েছে। তাদের সংসারে চার বছরের একটা মেয়ে আছে, মেয়ের সামনেই সুমন এমন নির্যাতন চালায়। আমি জানতে চেয়েছিলাম, আগেও কি সুমন এমন করেছে কখনো? সুমনের বউ বললো, 'না। আজই প্রথম।'

সকালে সুমনকে আর ডাকিনি। আমার বাইরে কিছু জরুরি কাজ ছিলো, তাই বের হতে হয়েছিলো। রাতে বাসায় এসে সুমনকে ডেকে পাঠালাম।

আমার কথা শুনে সুমন প্রথমে কিছুক্ষণ কোনো কথা বললো না৷ আমি দ্বিতীয়বার যখন আবার তাকে বিভ্রান্ত করার মতো কথাটা বললাম, চোখ দেখে আমার মন পড়তে পারার কথা, তখন সুমন তার অপরাধ স্বীকার করে নিলো।

বললো, ব্যবসায় খুব বড় ধরনের লোকসান হয়ে গেছে তার। বউকে এসব বলেনি। লোকসানটা এমনই বড় অংকের যে, মাঝেমধ্যে সে এমনকি আত্মহত্যার কথাও ভেবে বসছে। দুঃসময়ে মানুষ চেনা যায়, এতোদিন তার যতো শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলো, তারাও দূরত্ব বজায় রেখে চলছে। এই টেনশনে মেজাজটাও রুক্ষ হয়ে গেছে তার। আজ হঠাৎ সে তার বউয়ের গায়ে হাত তুলেছে এটা সত্যি। তার ভুল হয়েছে এবং এমনটা আর কখনোই করবে না বলে প্রতিজ্ঞা করে আমার কাছে।

আমি সুমনকে বললাম, 'এখনই তুমি বাসায় গিয়ে এর জন্য বউয়ের কাছে ক্ষমা চাইবে। ক্ষমা চাওয়াই এর যথাযথ বিচার নয় যদিও, তবে তোমার মানসিক অবস্থা এবং এবারই প্রথম এমন গর্হিত কাজ করেছো বলে আমিও তোমাকে আরেকটা সুযোগ দিলাম। আর ব্যবসায় লোকসানের কথাটা বউয়ের সাথে শেয়ার করবে। বউ কিছু করতে পারবে না ঠিক, তবু মনের কথা মনের মানুষকেই বলতে হয়।'

আমার কথা শুনে সুমন কেঁদে উঠলো। সুমন চলে গেলো। যাবার সময় সুমন বললো, 'আপনি কি সত্যিই চোখ দেখে মন পড়তে পারেন? আমি পারি না কেন?'

সুমনের এমন কথায়ও আমি বিভ্রান্ত করার হাসি দিলাম। যে হাসির অর্থ পারি আবার ঠিক পারিও না।

এই সৃষ্টিজগতের অপার রহস্যের চেয়েও আরো বেশি রহস্যময় মানুষের মনের জগত। সেই জগতের কথা অন্য কারোরই জানার সাধ্য নেই। আমারও থাকার প্রশ্নই আসে না। সেই অন্তর্যামী নেই বলেই বড় বাঁচা বেঁচে গেছে মানুষ।--

এসব সুমনকে বলা উচিত ছিলো। কিন্তু বলিনি। বললেও, সুমন বিশ্বাস করতো কিনা কে জানে!

Comments

Popular Posts