সময় ও অসময়
শহিদুল ইসলাম আকাশ
কাফনের কাপড় কিনছিলাম। কাফন আজকাল রেডিমেডই পাওয়া যায়। সেলাই করা থাকে। আনুষঙ্গিক অন্য সব কিছুই সাথে দিয়ে প্যাকেট করে রাখা হয়। চাইতেই দোকানি এক প্যাকেটে বাড়িয়ে দিলেন। দাম পরিশোধ করে বাইকের স্ট্যাডিংয়ে ঝুলিয়ে নিয়ে ছুটলাম।
যার জন্য এই কাফন কিনেছি, তিনি আমার নিকটাত্মীয়। বয়সও তেমন হয়নি, ছোট একটা মেয়ে আছে তাঁর, আরেকটা শিশু তাঁর স্ত্রীর গর্ভে বেড়ে উঠছে ক্রমশ, কয়েক মাসের মধ্যে সেও এই পৃথিবীর মুখ দেখবে।
সেই শিশু যখন এই পৃথিবীতে এসে প্রথম চোখ মেলবে, প্রথম যখন কেঁদে উঠবে, তখন শিশুটির চারপাশে সবাই থাকলেও, শুধু তার বাবা নামের মানুষটিই থাকবে না কোথাও__ভাবা যায়! যিনি এই সমগ্র সৃষ্টিজগতের স্রষ্টা, তিনি এমন নিষ্ঠুর ও নির্দয় না-হলেই কি পারেন না!
মৃত্যুর মাত্র কয়েক ঘন্টা আগেও তাঁর সাথে আমার কথা হয়েছে। মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানেই মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ করতে হলো তাঁকে! হঠাৎ! কী করে মেনে নিই! বলার মতো তেমন কোনো অসুস্থতাও ছিলো না তাঁর। জীবন অনিশ্চিত জানি, মৃত্যুই একমাত্র নিশ্চিত, কিন্তু সেই অনিশ্চয়তা এতোখানি!
প্রথমে শুনে মনে হলো, আমি ভুল শুনছি কিংবা কোনো দুঃস্বপ্ন যেন। সব স্বপ্নই তো ভাঙে একদিন। যখন তাঁর মৃতদেহের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, তখনো আমার মনে হচ্ছিলো, এ মৃত্যু নয়, ঘুমিয়ে আছেন তিনি এবং একসময় এই ঘুম ভাঙবে। সব ঘুমই তো ভাঙে একদিন। তারপরই তো সোনা রোদের ঝকঝকে সকাল।
কিন্তু না, এই কোনো দুঃস্বপ্ন নয়, ঘুমও__যখন জানলাম, কখন যে দু'চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো, খেয়ালই ছিলো না। সব ঘুম ভাঙে না কোনোদিন! কোনোদিনই না!
বাইকের স্ট্যাডিংয়ে ঝুলানো কাফন। ক্লাস ধরে গিয়ার কমাই ও বাড়াই, এস্কেলেটরে গতির উঠানামা করি। সূচিভেদ্য অন্ধকারে হেডলাইটের আলোয় ছুটে যেতে থাকি।
ছুটে যেতে যেতে আমার হঠাৎ মনে হলো, একদিন তো আমারও বেলা ফুরাবে, অনন্ত মেঘ, অনন্ত নক্ষত্রবীথি ও অনন্ত নীলের সারথি হবো একদিন এই আমিও। তবু কী অপরিসীম কাঙালপনা, এই বেঁচে থাকার! মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও! কোনো মানে হয়!
পুনশ্চ:
এক বছর আগের লেখা। গত বছর এই দিনেই আমার আত্মীয়টির মৃত্যুর পর এই লেখা লিখেছিলাম। ফেসবুকের 'মেমোরি' লেখাটা আবার সামনে নিয়ে এলো।
মৃত্যুর দিন-বিশেক পরেই, তাঁর স্ত্রী আরেকটি কন্যাশিশুর জন্ম দেন। সেই শিশুরও বয়স বছর হতে চললো। শিশুটি এখন হাসে, টুকটাক বলতেও শিখছে। পুরোপুরি বলতে যখন শিখবে, তখন হয়তো একদিন সে তার মাকে বলে বসবে, 'মা, সবার বাবা আছে, আমার নাই কেন!' মেয়ের এমন কথায়, মা তার মেয়েকে কী জবাব দেবেন--তা ভাবতেই, দীর্ঘশ্বাসে বুকটা ভারী হয়ে উঠে আমার।
'সময়' ও 'অসময়'--হায়, মৃত্যুর কাছে এই দুই শব্দের অর্থ কেন যে একই!
কাফনের কাপড় কিনছিলাম। কাফন আজকাল রেডিমেডই পাওয়া যায়। সেলাই করা থাকে। আনুষঙ্গিক অন্য সব কিছুই সাথে দিয়ে প্যাকেট করে রাখা হয়। চাইতেই দোকানি এক প্যাকেটে বাড়িয়ে দিলেন। দাম পরিশোধ করে বাইকের স্ট্যাডিংয়ে ঝুলিয়ে নিয়ে ছুটলাম।
যার জন্য এই কাফন কিনেছি, তিনি আমার নিকটাত্মীয়। বয়সও তেমন হয়নি, ছোট একটা মেয়ে আছে তাঁর, আরেকটা শিশু তাঁর স্ত্রীর গর্ভে বেড়ে উঠছে ক্রমশ, কয়েক মাসের মধ্যে সেও এই পৃথিবীর মুখ দেখবে।
সেই শিশু যখন এই পৃথিবীতে এসে প্রথম চোখ মেলবে, প্রথম যখন কেঁদে উঠবে, তখন শিশুটির চারপাশে সবাই থাকলেও, শুধু তার বাবা নামের মানুষটিই থাকবে না কোথাও__ভাবা যায়! যিনি এই সমগ্র সৃষ্টিজগতের স্রষ্টা, তিনি এমন নিষ্ঠুর ও নির্দয় না-হলেই কি পারেন না!
মৃত্যুর মাত্র কয়েক ঘন্টা আগেও তাঁর সাথে আমার কথা হয়েছে। মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানেই মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ করতে হলো তাঁকে! হঠাৎ! কী করে মেনে নিই! বলার মতো তেমন কোনো অসুস্থতাও ছিলো না তাঁর। জীবন অনিশ্চিত জানি, মৃত্যুই একমাত্র নিশ্চিত, কিন্তু সেই অনিশ্চয়তা এতোখানি!
প্রথমে শুনে মনে হলো, আমি ভুল শুনছি কিংবা কোনো দুঃস্বপ্ন যেন। সব স্বপ্নই তো ভাঙে একদিন। যখন তাঁর মৃতদেহের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, তখনো আমার মনে হচ্ছিলো, এ মৃত্যু নয়, ঘুমিয়ে আছেন তিনি এবং একসময় এই ঘুম ভাঙবে। সব ঘুমই তো ভাঙে একদিন। তারপরই তো সোনা রোদের ঝকঝকে সকাল।
কিন্তু না, এই কোনো দুঃস্বপ্ন নয়, ঘুমও__যখন জানলাম, কখন যে দু'চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো, খেয়ালই ছিলো না। সব ঘুম ভাঙে না কোনোদিন! কোনোদিনই না!
বাইকের স্ট্যাডিংয়ে ঝুলানো কাফন। ক্লাস ধরে গিয়ার কমাই ও বাড়াই, এস্কেলেটরে গতির উঠানামা করি। সূচিভেদ্য অন্ধকারে হেডলাইটের আলোয় ছুটে যেতে থাকি।
ছুটে যেতে যেতে আমার হঠাৎ মনে হলো, একদিন তো আমারও বেলা ফুরাবে, অনন্ত মেঘ, অনন্ত নক্ষত্রবীথি ও অনন্ত নীলের সারথি হবো একদিন এই আমিও। তবু কী অপরিসীম কাঙালপনা, এই বেঁচে থাকার! মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও! কোনো মানে হয়!
পুনশ্চ:
এক বছর আগের লেখা। গত বছর এই দিনেই আমার আত্মীয়টির মৃত্যুর পর এই লেখা লিখেছিলাম। ফেসবুকের 'মেমোরি' লেখাটা আবার সামনে নিয়ে এলো।
মৃত্যুর দিন-বিশেক পরেই, তাঁর স্ত্রী আরেকটি কন্যাশিশুর জন্ম দেন। সেই শিশুরও বয়স বছর হতে চললো। শিশুটি এখন হাসে, টুকটাক বলতেও শিখছে। পুরোপুরি বলতে যখন শিখবে, তখন হয়তো একদিন সে তার মাকে বলে বসবে, 'মা, সবার বাবা আছে, আমার নাই কেন!' মেয়ের এমন কথায়, মা তার মেয়েকে কী জবাব দেবেন--তা ভাবতেই, দীর্ঘশ্বাসে বুকটা ভারী হয়ে উঠে আমার।
'সময়' ও 'অসময়'--হায়, মৃত্যুর কাছে এই দুই শব্দের অর্থ কেন যে একই!

Comments
Post a Comment