নাগরদোলা
শহিদুল ইসলাম আকাশ
বহুদিন পর দেখা। ড্রাইভার গাড়ি থেকে পিছনের দরজা খুলে দিলো। নতুন মডেলের চকচকে গাড়ির ভেতর থেকে বের হলো সে। একটা শপিংমলের পাশ দিয়ে আমি হেঁটে যাচ্ছিলাম, তাকে দেখেও না-দেখার ভান করে চলে যাচ্ছি, আমাকে খেয়াল করে ফেললো তবু, ডাক দিলো।
দাঁড়াতেই হলো। একটু পর আট দশ বছরের একটা বাচ্চা ছেলেও গাড়ির ভেতর থেকে বের হয়ে এলো। জানালো, ছেলেটা তার। আমি ছেলের মাথায় হাত রেখে নাম জানতে চাইলাম, ছেলেটা বললো, 'আরিয়ান।'
সে বললো, ছেলের জন্য শপিং করতে এসেছে, আগামীকাল নাকি ছেলের জন্মদিন। আমাকেও তার সাথে শপিংমলের ভেতরে যেতে জোর করতে লাগলো। আমি অপারগতা জানাই, সে তবু ছাড়বে না আমাকে। বলে, 'কতোদিন পর দেখা! আসো না শপিং করতে করতে কিছুটা সময় কথাটথা বলি।'
অনিচ্ছাসত্ত্বেও তার কথা রাখতে হলো। শপিংমলের ভেতর ঢুকছি আর তার অতীতজীবনের কথা মনে পড়ছে আমার। অতি নিম্নবিত্ত থেকে কী এক অসাধারণ ক্ষমতায় জীবনটাকে রাঙিয়ে নিলো সে!
আমার চেয়ে বয়সে বছরদুয়েকের মতো বড় হবে সে। ছেলেবেলায় কতো বেলা যে খেয়ে না-খেয়ে থাকতে হয়েছে তাকে, তার হিসেবে নেই। অভাবের সংসার, একটু বুদ্ধি হতেই এই বাড়ি ওই বাড়িতে কাজ করে বেড়াতে হতো। মদ্যপ বাবা সারাদিন রিকশা চালায়। দিনমান রিকশা চালিয়ে যা কামায়, সন্ধ্যায় মদের পিছনেই তা উড়ায়। লেখাপড়াও করেনি কিছু।
বয়সে সামান্য বড় হলেও, আমি এবং আমরা অন্য বন্ধুরাও তাকে 'তুই' সম্বোধন করতাম। হামজারবাগ এলাকায় আমাদের সাথে সময়ে সময়ে ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন--এসব খেলায় সঙ্গী হতো সে।
একবার রোজার ঈদে সে একটা নতুন জামার কথা বললো আমাকে। আমার থেকে যদি একটা জামা তাকে দিই। সে তার বাবাকে অনেক বলেছে একটা নতুন জামা কিনে দিতে, কিন্তু তার বাবা জামা কেনার টাকা নেই বলে জানিয়ে দিয়েছে সাফ। নতুন না-হলেও, আমি মাকে বলে আমার পুরোনো একটা জামা তাকে দিই। ঈদের দিন সেই জামা পরে সে কী খুশি সে!
আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি, সেই সময় সে কোন এক আত্মীয়ের বাসায় কাজের জন্য ঢাকায় নাকি কোথায় চলে যায়। আমরা ছোটমানুষ আমাদের এতসব জানার কথা না।
এরপর মাঝে আরো দুই কি তিনবার তার সাথে দেখা হয়েছে। আজকের আগে একবার দেখা হয়েছিলো দুই বছর হয়। ঢাকায়। সেবার মিনিট বিশেকের মতো কথা হয়েছিলো তার সাথে। ব্যবসা করে রমরমা অবস্থা তখনও তার। আমি এর রহস্য জানতে চেয়েছিলাম, সে বললো, 'মিছেমিছি আমরা গরীব হয়ে থাকি, এই পৃথিবীতে সবচেয়ে সহজ কাজ হচ্ছে টাকা কামানো। মিথ্যেমিথ্যেই আমরা তাকে জটিল করে দেখি।' জানালো, পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী সে। ভিজিটিং কার্ড বাড়িয়ে দিলো আমাকে। কার্ড দেখে জানলাম, কাপড়ের, ক্রোকারিজের ও পরিবহনের ব্যবসা আছে তার। বললো, 'টাকা কামানোর জন্য সবচেয়ে সহজ হচ্ছে ব্যবসা। তুমি কোনো একটা কিছু দশ টাকা দিয়ে কিনলে। সেই জিনিস তুমি হয় এগারো টাকা বেচবে নয়তো দশ টাকা আট আনা। একবারে অসম্ভব হলে দশ টাকাই। এর নিচে বেচার প্রশ্নই আসে না। দিনশেষে তোমার লাভের হিসাবও বের করা সহজ।'
আজ আবার তার সাথে দেখা হওয়াতে, পুরোনো অনেক কথা মনে পড়ে গেলো। সে তার ছেলেকে নিয়ে নাম করা ব্র্যান্ডের একটা দোকানে ঢুকলো। ছেলের জন্য বেশ দামি একটা ব্লেজার কিনে নিলো। ছেলেকে সেই ব্লেজার পরিয়ে ঠিকঠাকমতো হচ্ছে না কিনা দেখে নিলো। ছেলেটা মহাখুশি।
তখন মনে মনে ভাবলাম, তার এই ছেলেটাও একদিন বড় হবে, বাচ্চাছেলেটা বড় হয়ে বিয়ে করে সংসারীও হবে নিশ্চয়, সন্তানসন্ততিও হবে তাহলে। এই ছেলেও সেদিন এমনি করে তার নিজের ছেলেকেও ইচ্ছেমত জামা কিনে দিতে পারবে তো!
কী জানি! জীবনটা কেমন যেন নাগরদোলা এক--এই কেউ উপরে উঠলো তো, এই আবার কেউ নিচে নেমে গেলো। কোনো মানে হয়!
বহুদিন পর দেখা। ড্রাইভার গাড়ি থেকে পিছনের দরজা খুলে দিলো। নতুন মডেলের চকচকে গাড়ির ভেতর থেকে বের হলো সে। একটা শপিংমলের পাশ দিয়ে আমি হেঁটে যাচ্ছিলাম, তাকে দেখেও না-দেখার ভান করে চলে যাচ্ছি, আমাকে খেয়াল করে ফেললো তবু, ডাক দিলো।
দাঁড়াতেই হলো। একটু পর আট দশ বছরের একটা বাচ্চা ছেলেও গাড়ির ভেতর থেকে বের হয়ে এলো। জানালো, ছেলেটা তার। আমি ছেলের মাথায় হাত রেখে নাম জানতে চাইলাম, ছেলেটা বললো, 'আরিয়ান।'
সে বললো, ছেলের জন্য শপিং করতে এসেছে, আগামীকাল নাকি ছেলের জন্মদিন। আমাকেও তার সাথে শপিংমলের ভেতরে যেতে জোর করতে লাগলো। আমি অপারগতা জানাই, সে তবু ছাড়বে না আমাকে। বলে, 'কতোদিন পর দেখা! আসো না শপিং করতে করতে কিছুটা সময় কথাটথা বলি।'
অনিচ্ছাসত্ত্বেও তার কথা রাখতে হলো। শপিংমলের ভেতর ঢুকছি আর তার অতীতজীবনের কথা মনে পড়ছে আমার। অতি নিম্নবিত্ত থেকে কী এক অসাধারণ ক্ষমতায় জীবনটাকে রাঙিয়ে নিলো সে!
আমার চেয়ে বয়সে বছরদুয়েকের মতো বড় হবে সে। ছেলেবেলায় কতো বেলা যে খেয়ে না-খেয়ে থাকতে হয়েছে তাকে, তার হিসেবে নেই। অভাবের সংসার, একটু বুদ্ধি হতেই এই বাড়ি ওই বাড়িতে কাজ করে বেড়াতে হতো। মদ্যপ বাবা সারাদিন রিকশা চালায়। দিনমান রিকশা চালিয়ে যা কামায়, সন্ধ্যায় মদের পিছনেই তা উড়ায়। লেখাপড়াও করেনি কিছু।
বয়সে সামান্য বড় হলেও, আমি এবং আমরা অন্য বন্ধুরাও তাকে 'তুই' সম্বোধন করতাম। হামজারবাগ এলাকায় আমাদের সাথে সময়ে সময়ে ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন--এসব খেলায় সঙ্গী হতো সে।
একবার রোজার ঈদে সে একটা নতুন জামার কথা বললো আমাকে। আমার থেকে যদি একটা জামা তাকে দিই। সে তার বাবাকে অনেক বলেছে একটা নতুন জামা কিনে দিতে, কিন্তু তার বাবা জামা কেনার টাকা নেই বলে জানিয়ে দিয়েছে সাফ। নতুন না-হলেও, আমি মাকে বলে আমার পুরোনো একটা জামা তাকে দিই। ঈদের দিন সেই জামা পরে সে কী খুশি সে!
আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি, সেই সময় সে কোন এক আত্মীয়ের বাসায় কাজের জন্য ঢাকায় নাকি কোথায় চলে যায়। আমরা ছোটমানুষ আমাদের এতসব জানার কথা না।
এরপর মাঝে আরো দুই কি তিনবার তার সাথে দেখা হয়েছে। আজকের আগে একবার দেখা হয়েছিলো দুই বছর হয়। ঢাকায়। সেবার মিনিট বিশেকের মতো কথা হয়েছিলো তার সাথে। ব্যবসা করে রমরমা অবস্থা তখনও তার। আমি এর রহস্য জানতে চেয়েছিলাম, সে বললো, 'মিছেমিছি আমরা গরীব হয়ে থাকি, এই পৃথিবীতে সবচেয়ে সহজ কাজ হচ্ছে টাকা কামানো। মিথ্যেমিথ্যেই আমরা তাকে জটিল করে দেখি।' জানালো, পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী সে। ভিজিটিং কার্ড বাড়িয়ে দিলো আমাকে। কার্ড দেখে জানলাম, কাপড়ের, ক্রোকারিজের ও পরিবহনের ব্যবসা আছে তার। বললো, 'টাকা কামানোর জন্য সবচেয়ে সহজ হচ্ছে ব্যবসা। তুমি কোনো একটা কিছু দশ টাকা দিয়ে কিনলে। সেই জিনিস তুমি হয় এগারো টাকা বেচবে নয়তো দশ টাকা আট আনা। একবারে অসম্ভব হলে দশ টাকাই। এর নিচে বেচার প্রশ্নই আসে না। দিনশেষে তোমার লাভের হিসাবও বের করা সহজ।'
আজ আবার তার সাথে দেখা হওয়াতে, পুরোনো অনেক কথা মনে পড়ে গেলো। সে তার ছেলেকে নিয়ে নাম করা ব্র্যান্ডের একটা দোকানে ঢুকলো। ছেলের জন্য বেশ দামি একটা ব্লেজার কিনে নিলো। ছেলেকে সেই ব্লেজার পরিয়ে ঠিকঠাকমতো হচ্ছে না কিনা দেখে নিলো। ছেলেটা মহাখুশি।
তখন মনে মনে ভাবলাম, তার এই ছেলেটাও একদিন বড় হবে, বাচ্চাছেলেটা বড় হয়ে বিয়ে করে সংসারীও হবে নিশ্চয়, সন্তানসন্ততিও হবে তাহলে। এই ছেলেও সেদিন এমনি করে তার নিজের ছেলেকেও ইচ্ছেমত জামা কিনে দিতে পারবে তো!
কী জানি! জীবনটা কেমন যেন নাগরদোলা এক--এই কেউ উপরে উঠলো তো, এই আবার কেউ নিচে নেমে গেলো। কোনো মানে হয়!

Comments
Post a Comment