হারিয়ে যাওয়ার খেলা
শহিদুল ইসলাম আকাশ
শীত মৌসুমে গ্রামীণ জনপদে ওরস অনেক পুরোনো ঐতিহ্য। মাজারগুলোতে নির্দিষ্ট নির্দিষ্ট দিনে এই সময়ে ওরস হয়। ওরস উপলক্ষে স্থানীয়রা তো আছেই, দূরদূরান্ত থেকেও মানুষ এসে বিশেষ জিয়ারত করে। চলে ওয়াজ মাহফিল, খাবারদাবার। সাথে বসে বর্ণাঢ্য মেলার আসর।
এমনই এক মেলায় ঘুরছিলাম। নানানরকম বাহারি খেলনা, কসমেটিকস, ফার্স্টফুড থেকে নাগরদোলা--কী নেই! এদিকওদিক ঘুরেফিরে দেখছি। টুকিটাকি কিছু কেনাকাটাও করছি। প্রচুর মানুষ। ভিড় ঠেলে যেতে যেতে রীতিমত প্রাণ ওষ্ঠাগত হওয়ার জোগাড়।
এরমধ্যে দেখি, এক বাবা তার সাত-আট বছর বয়সের বাচ্চাছেলেটার হাত ধরে ভিড়ের মধ্যে হাঁটছেন। ছেলেটাও শক্ত করে ধরে আছে বাবার হাত--পাছে হারিয়ে না যায়! একটু পর বাবাটা তাঁর সন্তানকে নিয়ে মেলা ছেড়ে যেতে চাইলে, ছেলের কান্না শুরু হয়ে গেলো। ছেলেটা কিছুতেই যেতে চায় না।
তাই দেখে আমার ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেলো। ছোটবেলায় আমি কখনো বাবার সাথে তো কখনো বড় ভাইদের হাত ধরে এই মেলাগুলোতে যেতাম। থাকতো নানান কিছু কেনার বায়না। সাধ্য অনুযায়ী কিনেও দেওয়া হতো। বাবা কিংবা ভাইদের হাত শক্ত করে ধরে রাখতাম আমিও--মানুষের ভিড়ে যদি হারিয়ে যাই! মেলায় দীর্ঘ সময় ঘুরার পর, ক্লান্তি হতো ঠিকই, কিন্তু মেলা ছেড়ে যেতে চাইতাম না কিছুতেই।
এই স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে খেয়াল করলাম, সেই বাবা আমার পাশ দিয়ে তাঁর ছেলেকে নিয়ে চলে যাচ্ছেন, মেলা থেকে বের হওয়ার মুখটা যেদিকে, সেদিকেই। তাঁর ছেলের কান্না তখনো থামেনি, বলছে, 'আরেকটু থাকি-না বাবা। আরো কতো কিছু কেনার বাকি!' বাবা ছেলেকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন, 'আজ আর না। চলো।'
বাবাটা তাঁর বাচ্চাছেলেটাকে নিয়ে মেলা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন। অনেকটা দূরে চলে যাওয়ার পরও, আমি তাকিয়ে দেখতে লাগলাম। ছেলেটার কান্নার শব্দ এখন আর শুনা যাচ্ছে না। কিন্তু বুঝতে পারছি, ছেলেটা এখনো কাঁদছে।
আমি তো বাচ্চাশিশু নই, তবু অনবধানে আমার নিজেকে সেই বাচ্চাশিশুটার জায়গায় বসাতে হলো। ইশ, কী এমন ক্ষতি হতো আরেকটুক্ষণ যদি মেলায় থাকা হতো! ক্ষণপরেই বুঝলাম, আমি তো আর বাচ্চাশিশু নই, বড় হয়ে গেছি অনেক। অনেক এবং অনেকই।
আর বড় হয়ে গেছি বলেই আমার তো বোঝার কথা যে, জীবনটাও একটা বর্ণাঢ্য মেলা। বড্ড ভিড় থাকে জীবনেও। এখানেও কারো হাত ধরে নির্ভরতা খুঁজতে হয়, পাছে হারিয়ে-না যেতে হয়! এই মেলা ছেড়েও যেতে চায় না কেউ, তবু এই মেলাও ছেড়ে যেতে হয়--এমনি করে কতো কতোই-না সাধ অপূর্ণ রেখে!
পার্থক্য শুধু এই যে, জীবনের এই মেলায় মানুষকে অসংখ্যবার হারিয়ে যেতে হয়--কোনো একজনের 'পরম' নির্ভরতার হাতটা ছেড়ে--অন্যের থেকে যেমন, হারিয়ে যেতে হয় এমনকি নিজের থেকে নিজেও। প্রকৃতি হারিয়ে যাওয়ার এই পার্থক্যটুকু না-রাখলেই কি হতো না! কোনো মানে হয়!
শীত মৌসুমে গ্রামীণ জনপদে ওরস অনেক পুরোনো ঐতিহ্য। মাজারগুলোতে নির্দিষ্ট নির্দিষ্ট দিনে এই সময়ে ওরস হয়। ওরস উপলক্ষে স্থানীয়রা তো আছেই, দূরদূরান্ত থেকেও মানুষ এসে বিশেষ জিয়ারত করে। চলে ওয়াজ মাহফিল, খাবারদাবার। সাথে বসে বর্ণাঢ্য মেলার আসর।
এমনই এক মেলায় ঘুরছিলাম। নানানরকম বাহারি খেলনা, কসমেটিকস, ফার্স্টফুড থেকে নাগরদোলা--কী নেই! এদিকওদিক ঘুরেফিরে দেখছি। টুকিটাকি কিছু কেনাকাটাও করছি। প্রচুর মানুষ। ভিড় ঠেলে যেতে যেতে রীতিমত প্রাণ ওষ্ঠাগত হওয়ার জোগাড়।
এরমধ্যে দেখি, এক বাবা তার সাত-আট বছর বয়সের বাচ্চাছেলেটার হাত ধরে ভিড়ের মধ্যে হাঁটছেন। ছেলেটাও শক্ত করে ধরে আছে বাবার হাত--পাছে হারিয়ে না যায়! একটু পর বাবাটা তাঁর সন্তানকে নিয়ে মেলা ছেড়ে যেতে চাইলে, ছেলের কান্না শুরু হয়ে গেলো। ছেলেটা কিছুতেই যেতে চায় না।
তাই দেখে আমার ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেলো। ছোটবেলায় আমি কখনো বাবার সাথে তো কখনো বড় ভাইদের হাত ধরে এই মেলাগুলোতে যেতাম। থাকতো নানান কিছু কেনার বায়না। সাধ্য অনুযায়ী কিনেও দেওয়া হতো। বাবা কিংবা ভাইদের হাত শক্ত করে ধরে রাখতাম আমিও--মানুষের ভিড়ে যদি হারিয়ে যাই! মেলায় দীর্ঘ সময় ঘুরার পর, ক্লান্তি হতো ঠিকই, কিন্তু মেলা ছেড়ে যেতে চাইতাম না কিছুতেই।
এই স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে খেয়াল করলাম, সেই বাবা আমার পাশ দিয়ে তাঁর ছেলেকে নিয়ে চলে যাচ্ছেন, মেলা থেকে বের হওয়ার মুখটা যেদিকে, সেদিকেই। তাঁর ছেলের কান্না তখনো থামেনি, বলছে, 'আরেকটু থাকি-না বাবা। আরো কতো কিছু কেনার বাকি!' বাবা ছেলেকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন, 'আজ আর না। চলো।'
বাবাটা তাঁর বাচ্চাছেলেটাকে নিয়ে মেলা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন। অনেকটা দূরে চলে যাওয়ার পরও, আমি তাকিয়ে দেখতে লাগলাম। ছেলেটার কান্নার শব্দ এখন আর শুনা যাচ্ছে না। কিন্তু বুঝতে পারছি, ছেলেটা এখনো কাঁদছে।
আমি তো বাচ্চাশিশু নই, তবু অনবধানে আমার নিজেকে সেই বাচ্চাশিশুটার জায়গায় বসাতে হলো। ইশ, কী এমন ক্ষতি হতো আরেকটুক্ষণ যদি মেলায় থাকা হতো! ক্ষণপরেই বুঝলাম, আমি তো আর বাচ্চাশিশু নই, বড় হয়ে গেছি অনেক। অনেক এবং অনেকই।
আর বড় হয়ে গেছি বলেই আমার তো বোঝার কথা যে, জীবনটাও একটা বর্ণাঢ্য মেলা। বড্ড ভিড় থাকে জীবনেও। এখানেও কারো হাত ধরে নির্ভরতা খুঁজতে হয়, পাছে হারিয়ে-না যেতে হয়! এই মেলা ছেড়েও যেতে চায় না কেউ, তবু এই মেলাও ছেড়ে যেতে হয়--এমনি করে কতো কতোই-না সাধ অপূর্ণ রেখে!
পার্থক্য শুধু এই যে, জীবনের এই মেলায় মানুষকে অসংখ্যবার হারিয়ে যেতে হয়--কোনো একজনের 'পরম' নির্ভরতার হাতটা ছেড়ে--অন্যের থেকে যেমন, হারিয়ে যেতে হয় এমনকি নিজের থেকে নিজেও। প্রকৃতি হারিয়ে যাওয়ার এই পার্থক্যটুকু না-রাখলেই কি হতো না! কোনো মানে হয়!

Comments
Post a Comment