সুখের সময়

শহিদুল ইসলাম আকাশ

 বিশ একুশ বছরের এক তরুণী এসেছে বিয়ের দাওয়াত দিতে। তার নিজের বিয়ে, সামনের শুক্রবারে। জনপ্রতিনিধি বলে এমনিতেই নানারকম দাওয়াতের অন্ত থাকে না আমার, প্রতিদিনই। প্রতিবারই দাওয়াত গ্রহণ করি এবং যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিই, যে প্রতিশ্রুতির বেশিরভাগই শেষ পর্যন্ত রক্ষা করা হয়ে উঠে না। কী আর করা! নিজের ব্যস্ততাও তো সীমাহীন।

কিন্তু এই মেয়েটির দাওয়াত গ্রহণ করে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম, যতো ব্যস্ততাই থাকুক, এই বিয়েতে আমাকে যেতেই হবে এবং যাবোও।

মেয়েটি আমার চেনা। সুমি নাম। সুমির যখন মাত্রই দুই বছর বয়স, তখন তার বাবা ও মার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় হঠাৎ। শুনেছি খুবই তুচ্ছ কারণে। এরপর দুই বছরের কন্যাশিশুকে নিয়ে সুমির মা তাঁর বাবার বাড়িতে চলে আসেন। সুমির নানা-নানি কেউ-ই বেঁচে ছিলেন না, দুই মামা আছেন, তাঁদেরও যাঁরযাঁর ছেলেমেয়ে আছে।

ছাড়াছাড়ির এক মাসের মাথায় সুমির বাবা আবার বিয়ে করেন, দুই বছরের মাথায় সুমির মাও অন্যত্র বিয়ে করে বসেন। মাসে মাসে বাবা সুমির ভরণপোষণ বহন করে যায় বটে, মাঝেমধ্যে মাও এসে দেখেটেখে যায়--কিন্তু বাবা-মার শূন্যতা এতোটুকু একটা মেয়ের পক্ষে মুখ বুজে মেনে নেওয়া, খুব সহজ কোনো ব্যাপার তো নয়, কিছুতেই। ছোট্ট সুমি চরম অবহেলা ও অনাদরে মামাদের সংসারে বড় হতে থাকে। পদে পদে অনেক লাঞ্ছনা ও বঞ্চনা সহ্য করেও মেয়েটা পড়ালেখাটা চালিয়ে গেছে। যে বয়সে বাবা-মার নিরবিচ্ছিন্ন আদর যত্ন ঘিরে থাকার কথা, সেই বয়সে কতো রাতের পর রাত একা নির্জনে নির্ঘুম থেকেছে সে, নিজের চোখের জলকে সঙ্গী করে! ভাবা যায়!

আমার দিকে সুমির বাড়িয়ে দেওয়া বিয়ের কার্ডটা হাতে নিতে নিতে বললাম, 'তোমার বিয়েতে আমি অবশ্যই যাবো।'

সুমি হাসলো। বললাম, 'বিয়ের দিন তোমার বরের সাথে একটু কথাও বলতে চাই, যদি সুযোগ হয়।'

আমার কথা শুনে সুমি আগ্রহভরে জানতে চাইলো, 'সুযোগের ব্যবস্থা হবে। কী বলবেন তাকে?'

কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ। তারপর বললাম, 'তোমার বরকে বলবো, যে মেয়েটার সাথে তোমার বিয়ে হচ্ছে, সে অসাধারণ একটি মেয়ে এবং একই সাথে দুঃখীও। এইটুকু জীবনেই এই মেয়েটিকে কী গভীর দুঃখ ও কষ্টের মধ্যে দিয়ে যে যেতে হয়েছে, কল্পনাও করতে পারবে না। তুমি কখনো এক মুহূর্তের জন্যও মেয়েটাকে কষ্ট দিও না। প্রতি মুহূর্তে তাকে বুঝিয়ে দিও যে, কী অপূর্বই-না আমাদের প্রত্যেকের এই জীবন, কী যে অদ্ভুত সুন্দর!'

সুমির হঠাৎ কী হয়, অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে হু হু করে কেঁদে উঠলো। আমার খুব ইচ্ছে হলো, মেয়েটির মাথায় একটু হাত রাখি। সুখের সময় যে কাঁদতে নেই কখনো!

Comments

Popular Posts