সৃষ্টির মূল কথা
শহিদুল ইসলাম আকাশ
শৈশবের কিছু স্মৃতি মস্তিষ্কের নিউরনে বেশ যত্নে জমা হয়ে থাকে। দিনে দিনে জীবনের গায়ে ধুলো জমে, কিন্তু সেই স্মৃতিগুলো একটুও রঙ হারায় না। হঠাৎ হঠাৎ কোনো কোনো বিশেষ মুহূর্তে সেই স্মৃতি বড় নাড়া দিয়ে যায়।
তখন কতো আর বয়স আমার__নয়, দশ কিংবা এগারো হবে হয়তো। সেই সময়ের কথা।
আমার বাবার আপন চাচা সুদীর্ঘ প্রবাস জীবনের অবসান করে দেশে ফিরে এলেন। একটানা পনেরো বছর প্রবাসে থেকে তিনি যখন ফিরলেন নিজ বাসভূমে, তখন তাঁর একমাত্র পুত্রসন্তানটি বাইশ বছরের টগবগে যুবক। তিনি সুদীর্ঘ সময় বিদেশবিভূঁইয়ে পড়ে থাকাতে তাঁর স্ত্রীর যেমন অন্তহীন আক্ষেপ ছিলো, অভিমান ছিলো তাঁর একমাত্র সন্তানেরও। সেই আক্ষেপ, অভিমানে মা-পুত্র তাঁর প্রতি কখনোই সদয় ছিলেন না। বড় অবহেলা, অযত্নে দিনাতিপাত করতে লাগলেন তিনি।
মৌরসি সম্পত্তি যেহেতু, সেহেতু আমাদের পাশেই ছিলো তাঁর বসতভিটা। প্রতিদিন বাড়ির উঠোনে চেয়ারে বসে থাকতেন তিনি, একা। কেউ তাঁর দিকে ভ্রুক্ষেপ করতেন না। কেউ যেমন যেচে তাঁর সাথে কথা বলতে যেতেন না, তিনিও নিজ আগ্রহে কাউকে খুব একটা ডাকতেন না।
ব্যতিক্রম ছিলাম শুধু আমি। আমাকে দেখলেই তিনি ডেকে উঠতেন। আগে কখনো দেখিনি বলে, তাঁর সাথে সহজ হতেও আমার ছোট্ট মন কেমন জানি দ্বিধায় ছিলো। বাবার চাচা, তাই সম্পর্কে আমার দাদা হবেন__এই বোধটুকু তখন ঢের হয়েছে বলা যায়। তাই প্রথম প্রথম তিনি যখন 'এই কেমন আছিস' বলতেন, তখন আমিও দূরে দাঁড়িয়ে জবাব দিতাম, 'ভালো আছি, দাদা'।
ষাট বছর পেরিয়ে যাওয়া এই মানুষটির সাথেই একটা সময় আমার নিবিড় বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। স্ত্রী, সন্তান থাকা সত্ত্বেও নিঃসঙ্গ দিনাতিপাত করা এই মানুষটিও যেন প্রাণ খুলে কথা বলার খুব বিশ্বস্ত একজন স্বজন খুঁজে পেলেন। এক-একদিন কতো কথা বলেন তিনি! কখনো কখনো তিনি খুলে বসেন তাঁর স্মৃতির ঝাঁপি। ওটুকু বয়সে এতো কঠিন বিষয় আমার বুঝার কথা নয়, তবু কোনো বিদগ্ধজনের মতো ছোট্ট আমি তখন যেন মনোযোগী শ্রোতা।
তিনি বলতেন, 'আমার বউ ও ছেলে আমাকে অনেকগুলো বছর কাছে পায়নি, আমার প্রতি তাঁদের এই উদাসীনতার যুক্তি আছে। একটা সময় ঠিক হয়ে যাবে। তাঁরা আমার প্রতি স্বাভাবিক হবে তখন।'
কিন্তু এই স্বাভাবিক হওয়ার সময়টা কখনোই আসে না। আমাকে পাশে নিয়ে তিনি তাঁর শৈশবের, প্রবাসজীবনের এমনকী যৌবনের গল্পও বলে যান অনায়াসে। ছোট্ট আমি অভিভূত হই।
সময় যায়। ষাটোর্ধ এই মানুষটি হঠাৎ একদিন অসুস্থ হয়ে যান। প্রচণ্ড অভিমানে ডাক্তার দেখাবার পক্ষপাতীও হলেন না। অবহেলায়, অযত্নে তিনি শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে রইলেন।
বিদ্যালয়ে যাওয়ার আগে এবং বিদ্যালয় থেকে ফিরে আমি রোজ তাঁকে দেখতে যাই। এক সন্ধ্যায় তিনি এমনভাবে আমার হাত ধরে ছিলেন, যেন আমার এই ছোট্ট হাতই এই পৃথিবীতে তাঁর একমাত্র নির্ভরতার হাত। বললেন, 'আমি হয়তো আর বাঁচবো না। আমার এখন শুধুই অনন্তযাত্রার অপেক্ষা।' বলেছেন ঠিকই, কিন্তু আমি তাকিয়ে দেখে, সেই অল্প বয়সেই আমার বুঝতে অসুবিধে হয়নি যে, তাঁর দু'চোখে তখনো বেঁচে থাকার সে কী সুতীব্র জেদ! যিনি নিজেই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন, সেই তাঁর চোখের এই বেঁচে থাকার জেদ, কী অর্থ বহন করে!
তাঁর সেই অনন্তের দিকে যাত্রার অপেক্ষা খুব দীর্ঘ হলো না। সেদিনই রাত ৩ টার দিকে তিনি এই ধরাধাম ছেড়ে গেলেন।
বেঁচে থাকতে যে স্ত্রী ও সন্তান তাঁর দিকে একটু ভালো করে ফিরেও তাকাননি, তাঁর মৃত্যুর পর সেই স্ত্রী-সন্তানই কেঁদেকেটে পুরো বাড়ি মাথায় তুললেন। পাশে দাঁড়িয়ে আমি দেখি আর ভাবি, যে কষ্ট তাঁরা এই মানুষটিকে দিয়েছেন, সে একই কষ্ট এখন তাঁরাও পাচ্ছেন।
কিছু প্রশ্ন তখন মনের গোপনে বারবার ঘুরেফিরে আসছিলো__কী হতো সমস্ত আক্ষেপ ও অভিমান ভুলে মানুষটাকে আপন করে নিলে? কীইবা এমন হতো, এই মানুষটাকে একটু ভালো ব্যবহার একটু স্নেহের স্পর্শ দিলে? একটু ভালোবাসার জন্য কী কাঙালই না ছিলেন মানুষটা!
আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে, সে রাতে ফিনিক ফোটা জোছনার রাত ছিলো। তাঁর মৃত্যুর খবর শুনে মা-বাবার সাথে আমি যখন তাঁকে দেখতে যাই, তখন রাত শেষভাগে। শেষ রাতে জোছনা এক পৃথক অবয়ব পেয়েছে তখন। যেন টুকরাটাকরা ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা জোছনার রূপোলী আলো থেমে থেমে বলছে আমায়, 'মনে রেখো, সমগ্র সৃষ্টির মূল কথা মূলত একটাই__বিষাদ।'
শৈশবের কিছু স্মৃতি মস্তিষ্কের নিউরনে বেশ যত্নে জমা হয়ে থাকে। দিনে দিনে জীবনের গায়ে ধুলো জমে, কিন্তু সেই স্মৃতিগুলো একটুও রঙ হারায় না। হঠাৎ হঠাৎ কোনো কোনো বিশেষ মুহূর্তে সেই স্মৃতি বড় নাড়া দিয়ে যায়।
তখন কতো আর বয়স আমার__নয়, দশ কিংবা এগারো হবে হয়তো। সেই সময়ের কথা।
আমার বাবার আপন চাচা সুদীর্ঘ প্রবাস জীবনের অবসান করে দেশে ফিরে এলেন। একটানা পনেরো বছর প্রবাসে থেকে তিনি যখন ফিরলেন নিজ বাসভূমে, তখন তাঁর একমাত্র পুত্রসন্তানটি বাইশ বছরের টগবগে যুবক। তিনি সুদীর্ঘ সময় বিদেশবিভূঁইয়ে পড়ে থাকাতে তাঁর স্ত্রীর যেমন অন্তহীন আক্ষেপ ছিলো, অভিমান ছিলো তাঁর একমাত্র সন্তানেরও। সেই আক্ষেপ, অভিমানে মা-পুত্র তাঁর প্রতি কখনোই সদয় ছিলেন না। বড় অবহেলা, অযত্নে দিনাতিপাত করতে লাগলেন তিনি।
মৌরসি সম্পত্তি যেহেতু, সেহেতু আমাদের পাশেই ছিলো তাঁর বসতভিটা। প্রতিদিন বাড়ির উঠোনে চেয়ারে বসে থাকতেন তিনি, একা। কেউ তাঁর দিকে ভ্রুক্ষেপ করতেন না। কেউ যেমন যেচে তাঁর সাথে কথা বলতে যেতেন না, তিনিও নিজ আগ্রহে কাউকে খুব একটা ডাকতেন না।
ব্যতিক্রম ছিলাম শুধু আমি। আমাকে দেখলেই তিনি ডেকে উঠতেন। আগে কখনো দেখিনি বলে, তাঁর সাথে সহজ হতেও আমার ছোট্ট মন কেমন জানি দ্বিধায় ছিলো। বাবার চাচা, তাই সম্পর্কে আমার দাদা হবেন__এই বোধটুকু তখন ঢের হয়েছে বলা যায়। তাই প্রথম প্রথম তিনি যখন 'এই কেমন আছিস' বলতেন, তখন আমিও দূরে দাঁড়িয়ে জবাব দিতাম, 'ভালো আছি, দাদা'।
ষাট বছর পেরিয়ে যাওয়া এই মানুষটির সাথেই একটা সময় আমার নিবিড় বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। স্ত্রী, সন্তান থাকা সত্ত্বেও নিঃসঙ্গ দিনাতিপাত করা এই মানুষটিও যেন প্রাণ খুলে কথা বলার খুব বিশ্বস্ত একজন স্বজন খুঁজে পেলেন। এক-একদিন কতো কথা বলেন তিনি! কখনো কখনো তিনি খুলে বসেন তাঁর স্মৃতির ঝাঁপি। ওটুকু বয়সে এতো কঠিন বিষয় আমার বুঝার কথা নয়, তবু কোনো বিদগ্ধজনের মতো ছোট্ট আমি তখন যেন মনোযোগী শ্রোতা।
তিনি বলতেন, 'আমার বউ ও ছেলে আমাকে অনেকগুলো বছর কাছে পায়নি, আমার প্রতি তাঁদের এই উদাসীনতার যুক্তি আছে। একটা সময় ঠিক হয়ে যাবে। তাঁরা আমার প্রতি স্বাভাবিক হবে তখন।'
কিন্তু এই স্বাভাবিক হওয়ার সময়টা কখনোই আসে না। আমাকে পাশে নিয়ে তিনি তাঁর শৈশবের, প্রবাসজীবনের এমনকী যৌবনের গল্পও বলে যান অনায়াসে। ছোট্ট আমি অভিভূত হই।
সময় যায়। ষাটোর্ধ এই মানুষটি হঠাৎ একদিন অসুস্থ হয়ে যান। প্রচণ্ড অভিমানে ডাক্তার দেখাবার পক্ষপাতীও হলেন না। অবহেলায়, অযত্নে তিনি শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে রইলেন।
বিদ্যালয়ে যাওয়ার আগে এবং বিদ্যালয় থেকে ফিরে আমি রোজ তাঁকে দেখতে যাই। এক সন্ধ্যায় তিনি এমনভাবে আমার হাত ধরে ছিলেন, যেন আমার এই ছোট্ট হাতই এই পৃথিবীতে তাঁর একমাত্র নির্ভরতার হাত। বললেন, 'আমি হয়তো আর বাঁচবো না। আমার এখন শুধুই অনন্তযাত্রার অপেক্ষা।' বলেছেন ঠিকই, কিন্তু আমি তাকিয়ে দেখে, সেই অল্প বয়সেই আমার বুঝতে অসুবিধে হয়নি যে, তাঁর দু'চোখে তখনো বেঁচে থাকার সে কী সুতীব্র জেদ! যিনি নিজেই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন, সেই তাঁর চোখের এই বেঁচে থাকার জেদ, কী অর্থ বহন করে!
তাঁর সেই অনন্তের দিকে যাত্রার অপেক্ষা খুব দীর্ঘ হলো না। সেদিনই রাত ৩ টার দিকে তিনি এই ধরাধাম ছেড়ে গেলেন।
বেঁচে থাকতে যে স্ত্রী ও সন্তান তাঁর দিকে একটু ভালো করে ফিরেও তাকাননি, তাঁর মৃত্যুর পর সেই স্ত্রী-সন্তানই কেঁদেকেটে পুরো বাড়ি মাথায় তুললেন। পাশে দাঁড়িয়ে আমি দেখি আর ভাবি, যে কষ্ট তাঁরা এই মানুষটিকে দিয়েছেন, সে একই কষ্ট এখন তাঁরাও পাচ্ছেন।
কিছু প্রশ্ন তখন মনের গোপনে বারবার ঘুরেফিরে আসছিলো__কী হতো সমস্ত আক্ষেপ ও অভিমান ভুলে মানুষটাকে আপন করে নিলে? কীইবা এমন হতো, এই মানুষটাকে একটু ভালো ব্যবহার একটু স্নেহের স্পর্শ দিলে? একটু ভালোবাসার জন্য কী কাঙালই না ছিলেন মানুষটা!
আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে, সে রাতে ফিনিক ফোটা জোছনার রাত ছিলো। তাঁর মৃত্যুর খবর শুনে মা-বাবার সাথে আমি যখন তাঁকে দেখতে যাই, তখন রাত শেষভাগে। শেষ রাতে জোছনা এক পৃথক অবয়ব পেয়েছে তখন। যেন টুকরাটাকরা ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা জোছনার রূপোলী আলো থেমে থেমে বলছে আমায়, 'মনে রেখো, সমগ্র সৃষ্টির মূল কথা মূলত একটাই__বিষাদ।'

Comments
Post a Comment