আরো একটি নতুন ভোর
শহিদুল ইসলাম আকাশ
সেদিন রাতে বিচিত্র একটি স্বপ্ন দেখলাম। দেখি, বিশ একুশ বছরের এক যুবক আমার সামনে দাঁড়িয়ে। তার হাতে একগুচ্ছ রজনীগন্ধা। ফুলগুলো আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে সে বলছে, 'এইগুলো রেনু আরাকে দেবে। আর বলবে, আমি তাকে অনেক অনেক ভালোবাসি।'
স্বপ্নের এই পর্যায়ে আমার হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো। আমি শুয়া থেকে উঠে বসলাম। কে এই যুবক! আমি কি আগে কখনো দেখেছি তাকে! তাছাড়া সে আমার দিকে একগুচ্ছ ফুল বাড়িয়ে দিয়ে তা কোন রেনু আরাকে দিতে বলছে! এ কোন রহস্যের ঘেরাটোপ!
এসব ভাবতে ভাবতে কিছুক্ষণ পর আমার হঠাৎ মনে পড়ে গেলো--এ তো কবির! পনেরো বছর আগে যে কবির মারা গেছে! এতোগুলো বছর পর হঠাৎ সে কেন আমার স্বপ্নে এসে ধরা দিলো! মাথায় জট লেগে যাচ্ছিলো। কবিরের কথা মনে করতে চেষ্টা করলাম। স্মৃতি প্রতারণা করলো না, একের পর এক নানা দৃশ্য ভেসে উঠলো মনের পর্দায়।
তখন লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে চট্টগ্রাম শহরে ছোটখাটো একটা ব্যবসা করি। ব্যবসায় লাভের চেয়ে লোকসানের পাল্লাই ভারী। তবু হাল ছাড়ছি না। নানারকম দুঃচিন্তায় থাকি। নতুন জায়গা, চেনাজানা মানুষের সংখ্যাও তেমন নেই। মনের কথা মনে আটকে দমবন্ধ হয়ে মরার মতো উপক্রম।
সেই সময় একদিন কবিরের সাথে আমার পরিচয়। আমারই সমবয়সী। মাত্র ক'দিনেই তার সাথে আমার বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। কবির রেয়াজুদ্দিন বাজারে একটা কাপড়ের দোকানের কর্মচারী। বেতন সাত কি আট হাজার টাকার মতো। ওর গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে। গ্রামে তার অসুস্থ বাবা-মা ও ছোট এক বোন। মাস শেষে বেতনের তিন ভাগের দুই ভাগ পরিবারের জন্য পাঠাতে হয়, বাকি এক ভাগে তার বাসা ভাড়া থেকে খাওয়াদাওয়া--সব কিছু সামলে নিতে হয় তাকে। বড় দুর্বিষহ অবস্থা তারও।
আমি আর কবির যারযার কাজকর্ম সেরে প্রতি রাতে বাইরের রাস্তায় স্ট্রিটলাইটের আলোয় হেঁটে বেড়াই, উদ্দেশ্যবিহীন। হাঁটতে হাঁটতে একজন আরেকজনের জীবনের গল্প বলি--আমাদের পরস্পরের অতীত থেকে বর্তমান, বাদ যায় না ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও।
রেনু আরা নামে তার গ্রামের প্রতিবেশী এক মেয়েকে ভালোবাসে কবির। মেয়েটিও তাকে। রেনু আরার প্রসঙ্গে যখন কথা বলে সে, তখন তার চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠে। কবিরের মানিব্যাগে মেয়েটির একটি ছবি আছে, লেমিনেটিং করা, প্রায়ই ছবিটা বের করে দেখে কবির। আমাকেও দেখিয়েছে অনেকবার। পরীর মতো সুন্দর মেয়েটা।
কবিরের হাতের লেখা ভালো না। তার হয়ে রেনু আরার কাছে প্রায়ই আমাকে চিঠি লিখতে হতো, কবির বলতো, আমি লিখতাম। বলতে বলতে কবির মাঝেমাঝে শব্দ করে কেঁদে উঠতো। আমি লেখা থামিয়ে দিতাম। কবিরের পিঠে হাত রেখে কান্না থামানোর চেষ্টা করতাম। বেশিরভাগ সময় তার এই কান্না সহজে থামতো না। এতোটা ভালো কেউ কারোকে বাসতে পারে, পাগল!
কবির স্বপ্ন দেখতো, একদিন তার সমস্ত দুঃখ দূর হবে, তার বাবা-মা পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবে, বিবাহযোগ্য ছোট বোনটাকে পাত্রস্ত করবে। তারপরই সে রেনু আরাকে বউ করে ঘরে তুলবে। এইসব স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে তার গলা ধরে উঠতো প্রায়ই, কান্না লুকিয়ে বলতো, 'সেই দিনটা যে কবে আসবে, কে জানে!'
সব স্বপ্ন সত্যি হয় না। স্বপ্ন ব্যাপারটাই কেমন যেন গোলমেলে। এক রাতের কথা। দোকান থেকে ফেরার পথে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয় কবির। পথচারী কয়েকজন তাকে হাসপাতালে ভর্তি করায়। শুনেই, আমি দ্রুত ছুটে যাই হাসপাতালে। বুকের বামপাশে ব্যান্ডেজ লাগানো, ব্যান্ডেজ আছে পুরো মাথাতেও। ডাক্তার বললেন, রোগীর অবস্থা খুব খারাপ, দশ থেকে বিশ ভাগের মতো সম্ভাবনা আছে বাঁচার।
কবিরের গ্রামের বাড়িতে খবর দিলাম, কবিরের মা-বাবা ও ছোট বোন এলো। একদিন সামান্য সময়ের জন্য কবির চোখ মেলেছিলো, অনেক কষ্টে থেমে থেমে বললো, 'রেনু আসেনি?' কবিরের মা-বাবা ও বোনটা হু হু করে কেঁদে উঠলো। কেঁদে উঠলো কবিরও, নিঃশব্দে।
ডাক্তার আগেই বলেছিলেন, কবিরের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ, হলোও তাই। দুর্ঘটনার এগারো দিনের দিন কবির মারা গেলো।
এরপর পনেরো বছর কেটে গেলো। কবিরের কথা ভুলেই গেছি বলা যায়। কিন্তু স্বপ্নে হঠাৎ কবির এসে এ কোন বার্তা দিয়ে গেলো! ভালোবাসাই কি একমাত্র বোধ, যা মৃত্যুর পরেও জেগে থাকে, বেঁচেও!
হঠাৎ আযানের শব্দে আমি সংবিৎ ফিরে পেলাম। কবিরকে স্বপ্নে দেখে, ঘুম ভেঙে, কবিরের কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমানোর কথা আর মনেও এলো না আমার। ফজরের আযান হচ্ছে অদূরের মসজিদে।
আমি বাইরে এসে দাঁড়ালাম। কবির এখনো আমার ভাবনা জুড়ে, রেনু আরাও। রেনু আরা মেয়েটি এখন কোথায় আছে, কেমন আছে কী জানি! জীবনটা তো যাপনের জন্যই, রেনু আরারও অন্য কোথাও বিয়ে হয়েছে নিশ্চয়! নিশ্চয় সন্তানসন্ততিও আছে! থাকতেই পারে। কিন্তু এই মুহূর্তে আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে, কবিরের শূন্যতা কি কখনো অনুভব করে রেনু! কবিরের জন্য এখনো কি হঠাৎ হঠাৎ তারও মন কেমন করে উঠে!
ফজরের আযান শেষ হলো একসময়। তারপর একটু একটু করে অন্ধকার কেটে গেলো ক্রমশ--এই পৃথিবীতে আরো একটি নতুন ভোর হলো। কী যে মোহন তার আলো!


Comments
Post a Comment