মনের কক্ষে

শহিদুল ইসলাম আকাশ

অনেকদিন পর মিলিকে দেখলাম। শেষ কবে দেখেছিলাম, মনে পড়ছে না। সম্ভবত বছর-দেড়েক হবে, কোনো এক সামাজিক অনুষ্ঠানে। এর মাস-দুই আগে বিয়ে হয়েছিলো মিলির। বিয়ের আগে মিলি নিজে এসে আমাকে দাওয়াত করে যায়, কিন্তু কী এক জরুরি কাজে বিয়েতে যেতে পারিনি আমি।

সেদিন সাথে মিলির স্বামীও ছিলো। ছেলেটা দেখতে রাজপুত্রের মতোই। মিলির পাশে বেশ মানিয়েছে ছেলেটাকে। তাদের দু'জনকে দেখে বুঝেছিলাম, সুখেই আছে তারা। কিন্তু এর কিছুদিন পরে লোক মারফত একদিন শুনি, মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনায় মিলির স্বামীর নাকি মৃত্যু হয়। বিধবা হতে হয় মিলিকে।

জমিজমা নিয়ে মিলির বাবা-চাচাদের মধ্যে তখন বিরোধ চরমে। সেই সময় একদিন মিলি তার বাবা-মা ও ছোট এক ভাইকে নিয়ে আমার কাছে আসে। সেই বিরোধ নিষ্পত্তি করতে আমার সহযোগিতা চায়। তখন আঠারোর তন্বী যুবতী মিলি। কলেজে পড়ে। জমিতে মিলির বাবার স্বত্ব যৌক্তিক ছিলো, আমি তা নিষ্পত্তি করে দিই। সেই সূত্রেই পরিচয় মিলির সাথে।

এতোদিন পরে মিলিকে দেখে একটু অবাক হতে হলো। তখন যেন প্রজাপতির মতো ছিলো মেয়েটা, কেবলই উড়তো আর উড়তো যেন। খুব চঞ্চল প্রকৃতির মেয়ে ছিলো মিলি। আগের সে মিলি নেই এখন আর। কেমন যেন চুপচাপ, বিষণ্ণ।

কুশল জানতে চাইলাম তার কাছে, সে নিচুস্বরে জানালো, 'আছি। মোটামুটি।' বললো, 'আপনি আমাদের অনেক বড় উপকার করেছেন। আপনি না-হলে আমার বাবার সব জমিজমা বেহাত হয়ে যেতো।' বললাম, 'ওসব কথা থাক। এখন কী অবস্থা তোমার?' একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো ওর গভীর থেকে, বললো, 'যাচ্ছে দিন। অকাল বিধবা হলে যা হয়...।' তারপর বললো, 'এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, ভাবলাম, আপনাকে আরেকবার কৃতজ্ঞতা জানিয়ে যাই। তাই আসা।'

আমি কী বলবো ভেবে পাচ্ছিলাম না, কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে বললাম, 'জীবনটাকে আবার নতুন করে শুরু করো মিলি। আমাদের সবার জীবনটাই যাপনের জন্যই, যা হয় তাকে মেনে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হয়।' 

মিলি বললো, 'এসব তত্ত্বকথা বলা সহজ। রাগ করবেন না।' কিছুই বললাম না আমি। মিলিই বললো, 'জানেন, আমার স্বামী দেখতে যেমন সুন্দর ছিলো, মানুষটাও ছিলো অসাধারণ। তাকে ভুলতে পারা বা তার জায়গায় অন্য কাউকে বসানো আমার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়।'

বললাম, 'আমাদের সবার মনে অনেকগুলো কক্ষ থাকে। কখনো কখনো একটি কক্ষ থেকে বেরিয়ে অন্য কোনো একটি কক্ষে যেতেই হয়।'

বলেই, নিজেই নিজেকে শাসালাম মনে মনে। সান্ত্বনা দিতেই বলা, এই পর্যন্ত ঠিক, কিন্তু বাস্তবতা কি তা? মনের ঘরে সত্যিই কি অনেকগুলো কক্ষ থাকে! 

বড়-বেশি রহস্যময় এই মানুষের মন। হয়তো অনেকগুলো নয়, মনের ঘরে একটিমাত্র কক্ষ মানুষের, সেখানেই অনেকগুলো মানুষের বসতি। এই একটিমাত্র কক্ষে কতো কেউ আসে আর যায়, কিন্তু একজনের বেলায় শুধু এই নিয়ম ভিন্ন হয়।

সেই একজন একবারই আসে, তার যাওয়া হয় না আর কখনোই। সেই একজন মানুষের একান্ত মানুষটি। যার কাছে প্রত্যেকের ভালোবাসা গচ্ছিত থাকে। 

মিলির বেলায়ও আমি এই সত্য অস্বীকার করি কোন উপায়ে!  

Comments

Popular Posts