সততার আয়না

শহিদুল ইসলাম আকাশ


রুমার মা আমার বাসায় কাজ করেন। তিন বছর ধরে কাজ করছেন, তার নামটা কখনো জানতে চাওয়া হয়নি, জানার প্রয়োজনও মনে করিনি--রুমার মা, এই নামেই ডাকি।

দুই বছর আগে, তাঁর মেঝ মেয়ের বিয়ের সময়, বেতনের বাইরে আমার কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে আমার স্ত্রী কিছু টাকা হাওলাত দিয়েছিলো তাঁকে, এরপর প্রতি মাসে বেতনের টাকা দেবার সময়, এর থেকে কিছু টাকা পরিশোধ করতে চান প্রতিবার, আমার স্ত্রী বেতন থেকে এক টাকাও কেটে রাখে না। অসুস্থতার জন্য গত মাসে চারদিন কাজে আসেননি রুমার মা, এই মাসে বেতন নেবার সময় অন্তত সেই টাকাটা হলেও রুমার মা কেটে রাখতে বললেন। শুনে আমার স্ত্রী বললো, 'যদি কখনো আপনাকে আমাদের বেতন দেবার সামর্থ্য না-থেকে, তখন মাগনা কাজ করে পুষিয়ে দেবেন। এখন দেনাটেনার কথা আর তুলবেন না।'

আজ ইফতারের সময় ঈদের কেনাকাটা নিয়ে কথা উঠলো। কার কী কী লাগবে, কাকে কাকে কী দিতে হবে, ইফতারের ফাঁকে এই আলাপ চলছিলো। আমার স্ত্রী বললো, 'রুমার মার জন্য ভালো দেখে একটা শাড়ি কিনতে হবে এবারও। সাথে তাঁর দুই মেয়ে ও তাঁর প্যারালাইজড স্বামীর জন্যও কিছু না কিছু কিনতে হবে।' আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম।

রুমার মার প্রতি আমার স্ত্রীর এই সম্মোহন কেন আমি তা জানি। গত তিন বছর ধরে রুমার মা আমার বাসায় কাজ করছেন, কিন্তু ঘর থেকে কখনো একটি জিনিসও চুরি হয়নি। ঘরের নানান প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র,  ফোনসেট এবং মানিব্যাগও এখানেওখানে পড়ে থাকে। রুমার মা সেই সব গুছিয়ে রাখেন প্রতিদিন। আমার মানিব্যাগ থেকেও কখনো একটি টাকাও সরেনি। দোকানে কিছু কিনতে পাঠালে প্রতিটি টাকা হিসেব করে বুঝিয়ে দেন আবার। একবার তাঁর ছোট্ট নাতনীকে সাথে নিয়ে এসেছিলেন, সেই নাতনী ভুল করে আমার চার বছরের ছেলের একটা খেলনা হাতে করে নিয়ে যায়। পরদিন খেলনাটা ফিরিয়ে এনে কেঁদেকেটে অস্থির হয়ে উঠেন রুমার মা। বলেন, 'নাতনীটা নিইয়া গেছিলো। আমারে মাফ দেন।' 'মাফ দেবার' কথা অবান্তর। উল্টো আরো দু'টি খেলনা রুমার মাকে দিয়ে আমার স্ত্রী বললো, 'এগুলোও আপনার নাতনীকে দেবেন।'

নিতান্ত কঠিন অসুস্থ না-হলে, তিনি অনুপস্থিত থাকেন না কখনো। সব কাজ ঠিকঠাকমতো শেষ না-হওয়া পর্যন্ত তিনি যানও না। রুমার মার এমন সততায় অভিভূত হয়ে আমার স্ত্রী তাঁর প্রতি সদয় হয়। বলা যায়, হতে বাধ্য হয়।

সততার গুণ অনেক। রুমার মার সেই গুণ আছে। তাই তো রুমার মাকে দেখে প্রতিদিন সততার পাঠ নিই আমিও। সততাই তো সেই আয়না, যে আয়নার সামনে দাঁড়াতে একটা আশ্চর্যরকম সুন্দর হৃদয় থাকা চাই। রুমার মাকে দেখে এই সত্যও খুব করে বুঝি আমি।

Comments

Popular Posts