তুচ্ছ হওয়ার আনন্দ।। শহিদুল ইসলাম আকা

শহিদুল ইসলাম আকাশ


ঘরের জন্য ফল কিনছিলাম। দোকানে নতুন আম দেখলাম, এক-দেড় কেজি আম দিতে বললাম দোকানদারকে। মৌসুমের প্রথম আম। দোকানদার আমের সাথে আপেল, মাল্টা আঙুরও দিতে চাইলো, না করলাম না। ঘরে তো এসব নিত্যই লাগে।

এই সময় আমার পাশে দাঁড়িয়ে কলেজের ইউনিফর্ম পরা এক ছাত্রী পেয়ারা কিনছে। কিনতে কিনতে কাকে যেন ফোন করলো সে, ফোনে বলছে, 'এই তোদের জন্য পেয়ারা কিনছি, বোস।'

পেয়ারার দাম পরিশোধ করে, মেয়েটি যখন চলে যাচ্ছিলো তখন এক বৃদ্ধা নারী মেয়েটির দিকে হাত বাড়ালেন। জীর্ণ পোশাক, দেখেই বুঝা যায়, ভিক্ষুক। মেয়েটি পার্স খুলে কিছু টাকা দিতে যাচ্ছে, বৃদ্ধাটি বললেন, 'টাকা লাগবো না। আমারে দুইটা পিয়ারা দিবা? আমার নাতী-নাতনীর ফলমূল খাওনের খুব শখ।' এমনও হতে পারে, বৃদ্ধা ভিক্ষুক মিথ্যে বলছেন, আদতে তাঁর কোনো নাতী-নাতনীই নেই, আবার থাকতেও পারে হয়তোবা--এসব বিবেচনায় মেয়েটি গেলো না। বৃদ্ধা নারীটির কথা শুনে মেয়েটি হেসে সদ্য কেনা পেয়ারাগুলোর থেকে দুটি পেয়ারা বৃদ্ধাকে দিলো।

পেয়ারা দুটি পেয়ে বৃদ্ধা নারীটি খুশিতে পাশ ফিরলেন। সাথেসাথেই মেয়েটি 'এই শুনেন' বলে বৃদ্ধাকে ডাকলো আবার। বৃদ্ধা এগিয়ে এলেন। মেয়েটি তাঁকে বললো, 'আপনার নাতী-নাতনি কয়টা?' বৃদ্ধা হেসে বললেন, 'দুই নাতনী এক নাতি।' 'কতো বড় হয়েছে তারা?' মেয়েটির প্রশ্ন। বৃদ্ধা বললেন, 'বড় দুইটাই নাতনী, বিয়ার লায়েক অইছে। নাতী অহনো ছোট। ছয় বৎসর বয়স। আমার মাইয়ার ঘরের। বাপ নাই ওগো। তিন বৎসর আগে জামাই মারা যাওনের পর হেরা আমার লগেই আছে।'

আমি পরবর্তী দৃশ্যের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।

পরবর্তী দৃশ্যে আমি যা দেখলাম তার জন্য আমি মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। মেয়েটি তখন তার হাতের সবগুলো পেয়ারা বৃদ্ধার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো, 'নিন, এগুলো সব আপনার নাতি-নাতনীদের দেবেন।' বৃদ্ধাও এতে কম অবাক হলেন না। বিস্ময়াভিভূত দৃষ্টিতে পেয়ারাগুলো হাতে নিলেন তিনি। মেয়েটি নতুন করে আর পেয়ারা না-কিনেই চলে গেলো। হয়তো আবার পেয়ারা কেনার টাকা অবশিষ্ট নেই তার। যাকে সে ফোন করে বলেছে পেয়ারা নিয়ে আসছে, সবাইকে বসতে বললো--খালি হাতে গিয়ে মেয়েটি তাদের কী বলবে কে জানে! ইচ্ছে হলো ডাক দিই তাকে, কিছু পেয়ারা কিনে দিই। কিন্তু যে নিজে দান করে, সে অন্যের দান নেবেইবা কেন! সেই দুঃসাহসও দেখালাম না তাই।

বৃদ্ধা নারীটিকে ডেকে আমিও সামান্য ফল কিনে দিলাম। তারপর দাম পরিশোধ করে আমার কেনা ফলগুলো বাইকের সাথে ঝুলিয়ে নিয়ে বাইক স্ট্যার্ট করলাম।

কিছুদূর এসে মেয়েটিকে আবার দেখলাম আমি। রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটছে সে। তাকে পাশ কেটে চলে যেতে লাগলাম। চলন্ত বাইক থেকে পিছু ফিরে কোনো তরুণী মেয়েকে দেখা অসৌজন্যতা শুধু নয়, অসভ্যতার মধ্যেই পড়ে। পিছু ফিরে তাকালাম না। শুধু বাইকের গতি সামান্য কমিয়ে লুকিং গ্লাসে মেয়েটিকে দেখতে চাইলাম একবার।

মেয়েটি দেখতে কেমন, এই প্রসঙ্গ অবান্তর। যার মনের ঐশ্বর্য এতো বিপুল, যার মনের সৌন্দর্য এতোখানি--তার আর কোনো রূপের বর্ণনার প্রয়োজনইবা কী!

লুকিং গ্লাসে মেয়েটিকে দেখে নিলাম এক পলক। তার মনের সেই ঐশ্বর্য ও সুন্দরের দ্যুতি, সামান্য লুকিং গ্লাসে আর কতোটুকুইবা ধরে! তবু হঠাৎ মেয়েটির কাছে নিজেকে আমার খুব তুচ্ছ মনে হলো। মনে হলেও, এর জন্য অনুতাপও লাগলো না কিছু। এরকম তুচ্ছ হওয়ার মধ্যে এক ধরনের আনন্দও কি নেই!

Comments

Popular Posts