অপরিসীম ভালোবাসা

শহিদুল ইসলাম আকাশ

'ভাইজান, মনে কিছু না-নিলে একটা সিগারেট ধরাইবার চাই।'

লক্ষ করলাম, 'পারি' বলেননি তিনি। বললেন, 'চাই'। তার অর্থ এই মুহূর্তে সিগারেটটা না-খেলে তাঁর চলবে না। শুধু সৌজন্যতা রক্ষার্থে আমাকে বলা।

সিএনজি অটোরিকশাতে করে এক জায়গায় যাচ্ছিলাম। গাড়িতে উঠে বসতে গিয়ে চল্লিশোর্ধ বয়সী চালকের এমন 'বলে নিয়ে' সিগারেট খেতে চাওয়া, খুব একটা খারাপও লাগলো না__অনেক চালক এটুকু সৌজন্যতাও তো দেখায় না, ঝটপট দেশলাই জ্বেলে সিগারেট ধরিয়ে বসে। যদিও যানবাহনে সিগারেট খাওয়া আমার নিজেরও অপছন্দ, তবু তাঁর কথায় বাধা দিলাম না তাঁকে।

সিগারেট ধরাতে ধরাতে তিনি বললেন, 'গাড়িতে সিগারেট খাওয়া উচিত না জানি। কিন্তু কী করুম কন, না-খাইয়াও তো বাঁচি না।'

আমি কিছু বললাম না। আমার বলা না-বলায় তাঁর কিছুই যেন আসে-যায় না। এরপর তিনি বললেন, 'একটা জব্বর ব্যাপার কি জানেন, মাইয়া মাইনষের কাছে সিগারেট হলো সতীনের মতো। রাবিয়া সিগারেট দেখলেই ঝগড়া লাগাইয়া দিতো।'

হঠাৎ কিছুটা কৌতূহল হলো আমার, রাবিয়া মেয়েটা কে? তিনি 'দিতো' বললেন কেন? এখন কি রাবিয়া সিগারেট খেতে দেখলে ঝগড়া 'লাগায় না'? তা জানতেও চাইলাম তাঁর কাছে।

তিনি বললেন, 'রাবিয়া আমার বউ আছিলো। আর এখন ঝগড়া লাগাইবো কেমনে কন দেখি, এখন তো সে আরেকজনের বউ।'

পুরো ব্যাপারটা আমার কাছে কেমন যেন রহস্যময় ঠেকলো। রহস্যময় কিছুর প্রতি আগ্রহ প্রবল হওয়াই স্বাভাবিক। বিশদ জানার জন্য আগ্রহী হয়ে উঠলাম।

তিনি বললেন, 'পরিবারের পছন্দে আমার বিয়া হইছিলো রাবিয়ার সাথে। বিয়ার কয়দিন পরে জানবার পারি, বিয়ার আগে কোন একটা পোলার সাথে তার 'লাইন' আছিলো। লাইন আছিলো ভালা কথা, কিন্তু বিয়ার পরে তারে ভুইলা যাওন উচিত আছিলো না? আছিলো কিনা কন দেখি? কিন্তু রাবিয়া সেই পোলাটারে ভুলবার পারে নাই। আমগো বিয়ার দুই মাস পরের কথা, সেই পোলার সাথে সে পালাইয়া গেলো একদিন। এরপর থিইকা অহনতরি রাবিয়ার আর কোনো খবর জানি না। কই আছে জানি না এহনো!'

এটুকু বলতে গিয়ে তাঁর গলা ধরে এলো, বিষণ্ণতা ছুঁয়ে গেলো তাঁকে। বললাম, 'রাবিয়া চলে গেছে কতোদিন হয়?'

এক মুহূর্তও না-ভেবে তিনি বললেন, 'ম্যালা বছর। দশ বছর, দুই মাস, সতেরো দিন।'

অভিভূত হলাম, বললাম, 'বাহ! দিনমাস পর্যন্ত মনে রেখেছেন দেখি! অনেক ভালোবাসতেন বুঝি তাঁকে?'

চলন্ত গাড়ি, এরমধ্যে এক পলকের জন্য পিছনে বসা আমার দিকে তাকালেন তিনি। তারপর আবার সামনের দিকে তাকিয়ে লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, 'ভালোবাসা! মাইয়া মাইনষে ভালোবাসার বুঝেটা কী কন? রাবিয়াও তো বুইঝলো না!'

বললাম, 'আপনি আর বিয়েথা করেননি?'

শব্দ করে হাসলেন তিনি, বললেন, 'করবার চাইছি অনেকবার। কিন্তু রাবিয়ার মতো কাউরে পাইলাম আর কই? বড় সুন্দরী আছিলো মাইয়াটা। আন্ধারেও জ্বলতো।'

তাঁর সাথে কথা বলতে বলতে কখন যে গন্তব্যে এসে পড়লাম খেয়ালই ছিলো না। আরো অনেক কথা হলো, সবটা জুড়েই ওই এক রাবিয়াই। রাবিয়ার চলে যাবার পরদিন থেকেই তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো, এই বুঝি রাবিয়া আবার ফিরে এলো! ফিরে এসে এই বুঝি তাঁর বুকে ঝাপিয়ে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে রাবিয়া বলবে, 'আমার বড় ভুল হইয়া গেছে!' সেই বিশ্বাস তাঁর এখনো আছে। এই জগতে কোনো কিছুই তো অসম্ভব নয়!

আমার গন্তব্যে এসে গাড়ি থামালেন তিনি। ভাড়া মিটিয়ে গাড়ি থেকে নামতে গিয়ে মনে মনে বললাম, রাবিয়া মেয়েটা এখন কোথায় আছে কী জানি! সে কি সুখি হয়েছে? একটি মুহূর্তের জন্য হলেও রাবিয়া কি বুঝতে পেরেছে কখনো যে, এতোদিন পরেও, একটি মানুষ তার জন্য আজও কী অপরিসীম ভালোবাসা বুকে বয়ে বেড়ায়! শুধুই তার জন্য! 


Comments

Popular Posts