বড় ব্যাপার

শহিদুল ইসলাম আকাশ


সাতসকালে পিতাপুত্র আমার বাসায় এলেন। অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকি বলে, খুব সকালে বিছানা ছেড়ে উঠতে পারি না। তবুও এমন ভোরে কেউ বাসায় এলে, উঠতেই হয়। জনপ্রতিনিধি বলে কথা। জনপ্রতিনিধিদের নিজের বলে কোনো ইচ্ছে থাকতে নেই। বিরক্তিও দেখানো চলে না।

বিরক্তি নিয়ে বিছানা থেকে উঠে, যথাসম্ভব বিরক্তি না-দেখিয়ে, পিতাপুত্রকে বসতে দিলাম। 

পিতা ভদ্রলোকটি আমার পূর্বের চেনাজানা। নির্বাচনের সময় আমার জন্য অনেক খেটেছেনও। ভদ্রলোককে বললাম, 'এই সাতসকালে কী মনে করে?'

তাঁর কলেজ-পড়ুয়া ছেলের সামনে অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা, কিন্তু ছেলে নাকি পরীক্ষা দিতে চাইছে না। ক'দিন আগে ছেলে নাকি এক বিব্রতকর ঘটনাও ঘটিয়েছে। এই পর্যায়ে আমি ভদ্রলোককে থামিয়ে দিলাম। বললাম, 'আপনি থামুন। বিব্রতকর ঘটনাটা কি তা আমি আপনার ছেলের মুখ থেকেই শুনতে চাই।' ছেলের দিকে তাকিয়ে আমি তার নাম জানতে চাইলাম প্রথমেই। ছেলে বললো, 'আরিফ।'

বললাম, 'ক'দিন আগে তুমি এমন কী করেছো যে, যার জন্য তোমার বাবা এতোটাই বিব্রতবোধ করছেন?'

আরিফ ছেলেটি কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর অন্য দিকে তাকিয়ে বললো, 'আমি বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করতে গেছি।'

এই ছেলে বলে কী! জানতেই চাইলাম, 'কেন!'

আরিফ জানালো, এক মেয়েকে সে ভালোবাসে, কিন্তু মেয়েটি কখনোই তার প্রেমে সাড়া দেয়নি। গত সপ্তাহে সেই মেয়েটির বিয়ে হয়ে যায়। এই কষ্টে সে আত্মহত্যা করতে চেয়েছে। মেয়েটির পরিচয় দেওয়ার পর, আমিও চিনলাম। বিয়েতে আমিও নিমন্ত্রিত ছিলাম। বিয়ের দিন বেশ কিছুটা সময় ছিলামও। মেয়েটিকে দেখেছিও সেদিন।

বললাম, 'বিষ কি খেয়েছিলে তুমি?'

আরিফের উত্তর, 'হুম। হাসপাতালে নিয়ে ওয়াশ করার পর বেঁচে যাই।'

আমি হাসলাম, বললাম, 'বর্তমানে বিষেও ভেজাল দেখছি।'

আমার কথায় আরিফও ঈষৎ হাসলো। বললাম, 'এখন সব কিছুতেই ভেজাল। প্রেম, ভালোবাসাও ভেজালের বাইরে নয়। বলা যায়, এতেই ভেজাল আরো বেশি।'

আরিফ ছেলেটাকে কিছু একটা বলা প্রয়োজন। প্রেম ভালোবাসাতেও ভেজাল কথাটা হয়তো সঠিক নয়। কেবল একটা মেয়ের ভালোবাসার জন্যই একটা ছেলে বিষ খেয়ে যেখানে নিজের জীবন দিয়ে দিতে চেষ্টা করে, ভেজাল কথাটা সেখানে কতোটা যুক্তিযুক্ত? এই জগতে কখনোই সত্যিকারের ভালোবাসার দিন শেষ হবে না।

আরিফকে বললাম, 'শুধু কি পাওয়ার মধ্যেই প্রেমের সার্থকতা থাকে? কখনোই না, এই না-পাওয়াও দারুণ একটা পাওয়া। তোমার মতো লেখাপড়া জানা ছেলের তা বোঝা উচিত।'

বললাম, 'এই পৃথিবীতে তুমি বারবার জন্ম নিতে পারবে না। জীবন একটাই। সেই জীবন তুমি নিজের ইচ্ছায় যাপন করবে শুধু, নিজের ইচ্ছায় শেষ করার মতো বোকামি, মূর্খতা আর কখনোই করবে না আশা করি।'

আরিফকে এর বেশি কিছু বলার মতো আমার ছিলো না। পিতাপুত্র যখন চলে যাচ্ছিলেন, আমি আরেকবার আরিফকে ডাকলাম। বললাম, 'পরীক্ষাটা অবশ্যই দেবে তুমি। আমাদের জীবনটা অনেক বড় ব্যাপার। সেখানে দুয়েকটা ঘটনা, তেমন কিছু নয়। এমন করে ভাবতে শেখো।'

আরিফ পরীক্ষাটা দিয়েছে শেষতক এবং খুব ভালো রেজাল্টও করেছে সে। এর দুই বছর পরের কথা, আরিফ বেসরকারি একটা কোম্পানিতে চাকরি পায় এবং বেতনও বলার মতোই।

আরিফের গল্পটা এখানেই শেষ করার ইচ্ছে ছিলো। কিন্তু শেষ করতে পারলাম না। কয়েকদিন আগের এক ঘটনার কথা উল্লেখ না করলেই নয়।

সেদিন আমার কাছে এক বিবাহিত নারী এলো। স্বামীর সাথে বনিবনা হচ্ছে না কিছুতেই। উপায়ন্তর না-দেখে, বিয়ের দুই বছর পরে এসে, স্বামীকে তালাক দিয়েছে সে। এখন পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের জন্য আমার কাছে আসা। মেয়েটিকে দেখে চেনাচেনা লাগলেও, চিনতে কষ্ট হচ্ছিলো। পরে পরিচয় দেওয়ার পর চিনলাম, এই সেই মেয়ে, যার জন্য আরিফ নামের ছেলেটি একদিন বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলো।

আমি তাকে আইনি প্রক্রিয়াগুলো বিশদ বলার পর বললাম, 'আরিফ নামের কারো কথা মনে আছে তোমার?' 

মেয়েটি অবাক হলো। একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। বললাম, 'যে ছেলে কোনো মেয়ের জন্য জীবন দিতে দ্বিধা করে না, একজন মেয়ের এক জীবনে এমন ছেলে একবারই আসে। যখন আসে, তখন তাঁকে নিজের করে নিতে না-পারলে, বাকি জীবন সেই ভুলেরই মাশুল দিয়ে যেতে হয়।'

আমার কথায় মেয়েটি কেঁদে উঠলো হঠাৎ। বললাম, 'তোমাকেও দোষ দেওয়া যায় না অবশ্য। চাই বা না-চাই, এই ভুল কমবেশি আমাদের সবারই হয়।'

সেই মুহূর্তে আমি ভেবে কূল পাচ্ছিলাম না যে, জীবন কি সত্যিই খুব বড় কোনো ব্যাপার? দুয়েকটা ঘটনা সেখানে সত্যিই কি খুব বড় কিছু নয়?

Comments

Popular Posts