পার্থক্য

শহিদুল ইসলাম আকাশ

রাত এগারোটায় মোরশেদ আমার বাসায় এলো। বললো, 'আপনি আসতে বলেছিলেন, তাই চলে এলাম।'

আমি আসতে বলেছি! মনে পড়লো, দুপুরে আমি একটা জরুরি কাজে যাচ্ছিলাম, এই সময় মোরশেদ সামনে পড়লো। আমাকে থামিয়ে 'কেমন আছি' 'কোথায় যাচ্ছেন' জাতীয় কথা বললো। আমি ব্যস্ততার জন্য তার কাছ থেকে রেহাই পেতে বললাম, 'বাসায় এসো একদিন। কথা হবে। এখন যাই।' কিন্তু এ তো নিছকই কথার কথায় বলা। এতেই এতো রাতে বাসায় আসতে হবে! তাও আমার লেখা ও পড়ার এই সময়টাতেই!

বসতে দিলাম। অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের অখণ্ড 'নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে' পড়ছিলাম, মনটা পড়ে আছে বইটাতে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও মোরশেদের সাথে কথা বলতে বসতে হলো। কী আর করা, মুখের উপর তো আর বলা যায় না যে, 'আমি একটা বই পড়ছি, তুমি এখন যাও।'

মোরশেদের সাথে আমার পরিচয় মাত্র অল্পদিনের। ছয় মাস আগে তার স্ত্রী তাকে ডিভোর্স দেয়। ডিভোর্সের নোটিশ পাওয়ার পর মোরশেদ আমার শরণাপন্ন হয়, সংসারটা সে টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিলো, অনেক ভালোবাসতো স্ত্রীকে। কিন্তু স্ত্রীর সেই ইচ্ছে ছিলো না। শত চেষ্টাতেও তাই এই সংসার রক্ষা করতে পারিনি। ডিভোর্স হয়ে গেলো। বিয়ের মাত্রই আড়াই বছরের মাথায়।

মোরশেদ মধ্যপ্রাচ্যের কাতার প্রবাসী। বিয়ের কিছুদিন পর তাকে কাতার চলে যেতে হলে, এরমধ্যে অন্য কোন একটা ছেলের সাথে মোরশেদের স্ত্রীর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। শুনেছি ডিভোর্সের কিছুদিনের মধ্যেই মোরশেদের সেই স্ত্রী আবার বিয়ে করে এবং তা তার পছন্দের সেই ছেলের সাথেই।

মোরশেদ এখন দেশেই আছে। সে আর বিদেশ যায়নি এবং আর যাবে না বলেই নাকি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিভিন্ন সময় আমি অনেক বুঝিয়েছি, কিন্তু মোরশেদ তার নিজের সিদ্ধান্তেই অটল, সে আর বিদেশ যাবেই না।

আমার পাশের সোফায় মোরশেদ বসে আছে। সৌজন্যতা রক্ষা করতেই বিরক্তি আড়াল করে বললাম, 'তা আর কী খবর তোমার?' মোরশেদ হাসলো, বললো, 'চলছে মোটামুটি।' এরপর আমি কী বলবো ভাবছিলাম, মোরশেদই বললো, 'মুন্নীর সাথে দেখা হয়েছিলো দুই দিন আগে। সাথে ওর স্বামীও ছিলো।' মোরশেদের সেই স্ত্রীরই নাম মুন্নী।

বলেই আবার চুপ হয়ে গেলো মোরশেদ। আমি নিরবতা ভাঙলাম না। কথাটথা হয়েছে কিনা কিংবা কেমন দেখলো--এসব জানতে চাইলাম না আমি। কিছুক্ষণ পর অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে ফেললো সে। মোরশেদ কাঁদছে। শব্দহীন সেই কান্না দেখে আমি বসা থেকে উঠে মোরশেদের সামনে গিয়ে তার মাথায় হাত রাখলাম। চোখ তুলে আমার দিকে তাকিয়ে সে বললো, 'মুন্নী আমাকে এতো বড় আঘাত দেওয়ার পরও আমি আজো তাকে ভুলতে পারিনি।'

আমি তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, 'যে অনায়াসে ভুলে যায়, তাকেই মনে রেখে কষ্ট পাওয়ার কোনো মানে হয় না। ভুলে যাও। ভুলতে তো মানুষই পারে, তুমি কেন পারবে না?'

এরপর আরো কিছু সময় মোরশেদ ছিলো। সে চলে যাওয়ার পর আমি আবার অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে' উপন্যাসটা খুলে বসলাম। কিন্তু কিছুতেই আর বইয়ে মন বসছে না। বই শেল্ফে রেখে বিছানায় এসে শুয়ে পড়লাম। শুলাম ঠিকই কিন্তু ঘুমও এলো না।

মুন্নীর কথা ভাবতে লাগলাম। আমি জানি না মুন্নী মেয়েটা সুখি হয়েছে কিনা! গাছে ফুটে থাকা ফুল আর গাছ থেকে ছেঁড়ার পরের মুহূর্তেই ফুল--দুটোর মধ্যে পার্থক্য অনেক। এতোদিনে মুন্নী কি এই পার্থক্য বুঝতে পেরেছে! পারারই তো কথা।   

Comments

Popular Posts