বজলু ভাই

শহিদুল ইসলাম আকাশ

বজলু ভাইয়ের দোকানে আছি। রাত বেশি হয়ে গেছে, বজলু ভাই দোকান বন্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

ছোট্ট ষ্টেশনারী দোকান। টুকটাক নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনি এখান থেকে। দুয়েকদিনের বিরতিতে বজলু ভাইয়ের দোকানে আসা হয় আমার।দোকানের সামনের বেঞ্চিতে বসে বজলু ভাইয়ের সাথে কিছু সময় কথা বলি। 

বিয়েথা করেননি বজলু ভাই। পঞ্চাশ বছর বয়স চলছে, এখনো বিয়ের নামগন্ধ নেই। মাঝেমাঝে বজলু ভাইকে বিয়ের তাগাদা দিই, তিনি শুধু হাসেন। কখনোকখনো বলেন, 'এই একখান ছোট দোকান করি, এই আয়ে আমারই চলে না, বউরে খাওয়ামু কী!' শুনে বলি, 'কী যে বলেন বজলু ভাই, ফকিরমিসকিনরাও বিয়ে করে, তারা চলে কীভাবে! সামান্য হলেও, আপনার তো আয়ের একটা ব্যবস্থা আছেই।' তারপর দার্শনিকের মতো বলি, 'সংসারই জীবনের বিধান। এখানে কাঁটা যেমন থাকে, ফুলও আছে।' 

এসব শুনে তবুও বজলু ভাই ভরসা পান না। উল্টো বলেন, 'রাইতবিরেতে বউয়ের লগে ঝগড়া, ছেলেপুলে হইলে তো আরেক জ্বালা, সারাক্ষণ তাগো চিন্তা। না ভাই, আমি এসবের মধ্যে নাই।' 

বজলু ভাই চলেন তাঁর নিজের খেয়ালে। যেন এই জগতে বিয়ে নামক শব্দটা না-হলেও তেমন কিছু আসে-যায় না--সংসার যেন নিছক এক প্রথার নাম।

বজলু ভাই দোকানের মালামাল অনেকটাই গুছিয়ে ফেলেছেন, এখন দরজা টেনে তালা লাগানোই বাকি। আমাকে দেখে বললেন, 'কিছু লাগবো।' বললাম, 'না। আজ লাগবে না কিছু। আপনি দোকান বন্ধ করার কাজ শেষ করুন। তারপর আপনার সাথে বসে কথা বলবো।' বজলু ভাই হাসলেন, 'তোমার আর কথা কী, সবসময় তো ওই একটাই কথা, বিয়া বিয়া।' হাসলাম আমিও।

বজলু ভাই দোকানে তালা লাগিয়ে তালাগুলো আরেকবার টেনে দেখলেন, ঠিকঠাক লাগানো হয়েছে কিনা যাচাই করা। পাশের এক চায়ের দোকান তখনো খোলা। আমি বজলু ভাইকে নিয়ে লেবু ও আদা দেওয়া রঙ চা খেলাম। খেতে খেতে বললাম, 'আপনার কি ইচ্ছে করে না, রাতে যখন বাসায় ফেরেন, তখন কেউ আপনার জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকুক? কারণে অকারণে আপনার সাথে অভিমান করুক? একটা দুটো দুষ্টুদুষ্টু বাচ্চা থাকুক ঘরের মধ্যে? কি, এমন ইচ্ছে করে না?'

বজলু ভাই ঠোঁটের কোণায় হাসি ফুটিয়ে বললেন, 'তুমি দেখি আবার শুরু করলা পুরোনো প্যাঁচাল। এহন আর ইচ্ছে হইলেও কিছুই করবার নাই।'

বলেই, বজলু ভাই হাঁটা শুরু করলেন। আমি চায়ের দাম চুকিয়ে বজলু ভাইয়ের চলে যাবার দিকে তাকিয়ে আছি। আমি তখনো ঠায় দাঁড়িয়ে। চায়ের দোকানদারটাকে আরেক কাপ চা দিতে বললাম। দাঁড়িয়ে সেই চা খেতে খেতে আমি আমার পরবর্তী গল্পটা সাজিয়ে নিতে চেষ্টা করতে লাগলাম। একটা গল্প বজলু ভাইকে নিয়ে লিখলে কেমন হয়?

হুম। লেখা যায়। টুকটাক লিখি বলেই, আমিও কল্পনায় নানান ছবি আঁকতে জানি। 


বজলু ভাইকে নিয়ে একের পর এক দৃশ্য কল্পনায় এঁকে নিতে লাগলাম। গল্পের বজলু ভাই, বাস্তবের বজলু ভাইয়ের সাথে কোনো যোগ নেই। আমার গল্পের এই বজলু ভাইয়ের চমৎকার একটা বউ আছে। দুষ্টুদুষ্টু একটা ছেলে ও একটা মেয়ে আছে। ছুটির দিনে এই বজলু ভাই বউবাচ্চাকে নিয়ে বেড়াতে যায়, শিশুপার্ক কিংবা চিড়িয়াখানায়। অনেকরাত পর্যন্ত বউয়ের সাথে জেগে থাকে, বউয়ের দিকে বজলু ভাইয়ের থাকে প্রেমময় দৃষ্টি। যে প্রেম বাস্তবের বজলু ভাইকে কখনোই স্পর্শ করেনি।

Comments

Popular Posts