পিতা ও কন্যার গল্প
শহিদুল ইসলাম আকাশ
ঢুকেই তিনি রংফর্সাকারী ক্রিম চাইলেন। দোকান-কর্মচারী কয়েকরকম ব্রান্ডের ক্রিম দেখালেন, রিকশাচালক সেখান থেকে একটি ক্রিম বেছে নিলেন। দাম পরিশোধ করে দোকানের বাইরে সানসিটের নিচে গিয়ে দাঁড়ালেন।
বাইরে ঝুম বৃষ্টি। সাথে থেমে থেমে বিজলী চমকাচ্ছে, থেমে থেমে মুহুর্মুহু বজ্রপাতও। রিকশাচালক লুঙ্গির ভাঁজ থেকে পলেথিনে মোড়ানো বিড়ির প্যাকেট ও দিয়াশলাই বের করে বিড়ি ধরালেন। বিড়িটা খাওয়া শেষ হলেই হয়তো তিনি যাবেন। ঝড়বৃষ্টি রিকশাচালকদের জন্য তেমন কঠিন কিছু নয়। এসব উপেক্ষা করার অভ্যাস তাঁদের আছে।
আমি আমার প্রয়োজনীয় পণ্যগুলো কিনে স্টোরের বাইরে রিকশাচালকটার পাশে এসে দাঁড়ালাম। এই বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না।
রিকশাচালক লোকটা এতোক্ষণ বোধহয় আমাকে খেয়াল করেননি এবং বোধহয় আমাকে চেনেনও। আমাকে দেখতেই তিনি হাতের জ্বলন্ত বিড়ি আড়াল করতে চাইলেন। আমাকে সালামও দিলেন।
আমি সালামের প্রতিউত্তর দিয়ে তাঁর হাতের ক্রিমের দিকে চোখ রেখে বললাম, 'কার জন্য কিনেছেন এটা?' রিকশাচালক বললেন, 'আমার মাইয়ার লাগি। বিবাহযোগ্য মাইয়া। সারাদিন খালি সাজগোছের উপর থাকে। সকালে একটা ক্রিমের জন্য বায়না ধরছিলো। বললাম, হাতে টেহাপয়সা একদম নাই। কিন্তু মাইয়া বুঝবার চায় না। হঠাৎ রাগ উইঠা যায় আমার, থাপ্পড় লাগাইয়া দিতে হইলো ওর গালে।'
এটুকু বলে তিনি আড়াল করা হাতের বিড়িটা সাবধানে নিচে ফেলে দিলেন, যাতে আমার চোখে না-পড়ে। তারপর বললেন, 'সকালে রিকশাটা নিয়ে বাইর হইছি, ভাড়াও মারছি ঠিকই--কিন্তু মনটা খারাপ হইয়া ছিলো সারাদিন। একটা ক্রিমই তো চাইছিলো মাইয়াটা, এর জন্য থাপ্পড় দেওনের কী দরকার!'
আমি বললাম, 'ক্রিম তো কিনেছেন, এখন নিশ্চয় আর মন খারাপ নেই?' রিকশাচালক হাসলেন, বললেন, 'এহনো আছে। ঘরে গিয়ে মাইয়াকে বুকে জড়াইয়া এই ক্রিম তার হাতে না-দেওন পর্যন্ত মন পুরাপুরি ভালা হইবো না।'
কথা বলতে বলতে বৃষ্টি কিছুটা কমে এসেছে। পুরোপুরি যায়নি। রিকশাচালক যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। বিড়ি ও দিয়াশলাই আগেই লুঙ্গির গিঁটে গুঁজে নিয়েছিলেন, এবার পলেথিনে মোড়ে ক্রিমটাও গুঁজলেন। রিকশার উপর বসতে বসতে বসতে বললেন, 'মাইয়াটা মায়ের দিকেই গেছে। ওর মাও বেজায় সুন্দর। জিদ্দিও। মায়ের মতো জিদও আছে মাইয়ার। তয় মায়ের মতো মাইয়ার মনটাও বড় ভালা।'
বলেই, যেন কী এক অপার সঞ্জীবনী শক্তিতে রিকশার প্যাডেলে পা চালিয়ে তিনি চলে যেতে লাগলেন। আমি তাঁর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলাম অপলক। কী সীমিত তাঁদের সাধ, সাধ্যও!
মেয়েটার কথা ভাবলাম। বাবা যখন ক্রিম নিয়ে বাসায় ফিরবেন এবং সেই ক্রিম মেয়ের হাতে দেবেন--তখন বাবা-মেয়ের অনিন্দ্য আনন্দের সেই মুহূর্তটা একবার যদি দেখতে পেতাম!


Comments
Post a Comment