পরখ করে দেখা
শহিদুল ইসলাম আকাশ
একটা সামাজিক সংগঠনের এক অনুষ্ঠানে জ্যাকের সাথে আমার পরিচয় হয়। বয়স ষাটের কাছাকাছি, কিন্তু দেখতে চল্লিশের বেশি মনে হয় না। খাওয়াদাওয়া ও নিয়মিত শরীরচর্চাই এর রহস্য হয়তো। একটানা পঁচিশ বছর ধরে আমেরিকায় থেকে অতিসম্প্রতি দেশে এসেছেন তিনি। মূলত তাঁর নাম জাকির, আমেরিকায় গিয়ে সেই নাম 'জ্যাক' হয়ে গেছে। তিনি অবশ্য জ্যাক নামেই পরিচয় দিতে নাকি বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। পঁচিশ বছরের নিয়ম, এতো সহজে ভুলবারও নয়।
আমি জনপ্রতিনিধি শুনে তিনি আমার ফোন নাম্বারটা যেচে চেয়ে নিলেন। বললেন, আপাতত কিছুদিন দেশে থাকবেন তিনি, কোনো দরকারে যদি আমার প্রয়োজন পড়ে, এই জন্যই নাম্বারটা নিয়ে রাখা।
সেদিনের পর প্রায়ই ফোন করেন তিনি। যদিও দরকারি কাজে ফোন দেওয়ার কথা থাকলেও, ফোনে তিনি দরকারি তেমন কিছুই বলেন না। 'কেমন আছো?' 'কী করছো?' জাতীয় কথার বাইরে আর কথা এগোয় না।
ক'দিন আগে আমার বাসায় এসেছেন একবার। বন্ধের দিন ছিলো বলে আমি ফ্রি ছিলাম। ঘন্টাখানেক ছিলেন। ওইদিন তিনি বিদেশ যাবার আগের, তাঁর যুবক বয়সের গল্প বললেন সবটা সময়। তখন নাকি দীপা নামে একজনের সাথে প্রেম ছিলো তাঁর। দীপা মেয়েটাও ভালোবাসতেন তাঁকে। বছর দুয়েকের পরে দেশে ফিরে এসে দীপাকে বিয়ে করে আমেরিকায় নিয়ে যাবেন ভেবে রেখেছিলেন। কিন্তু জ্যাক আমেরিকায় যাবার এক বছর পরেই দীপার অন্যত্র বিয়ে হয়ে যায়। রাগে ও দুঃখে জ্যাক তাই আর দেশে আসেননি। পঁচিশটা বছর তিনি কাটিয়ে দিলেন আমেরিকাতেই।
জ্যাক কিছুটা উদাস হয়ে বললেন, 'বিয়ে না করলেও, আমেরিকাতে বেশ কয়েকটা মেয়ের সাথে লিভিং টুগেদার করেছি আমি। ওদেশে এইসব ডালভাত।' একটু থেমে ঘরের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তবে সত্যি কি জানো, এতো এতো মেয়ের ঘনিষ্ঠ সাহচর্য পেয়েছি, দীপার কাছে গেলে যেমন সব গ্লানি ও তুচ্ছতা ভুলে যাওয়া যেতো--এই জীবনে তা অন্য কোনো নারীর মধ্যেই আমি পাইনি। কী বিচিত্র, তাই না!'
জানালেন, দেশে এসে তিনি প্রথমেই দীপার খুঁজ করেছেন। জেনেছেন দীপা বেঁচে নেই। কীভাবে দীপার মৃত্যু হয়েছে, সেই ডিটেইলসে তিনি গেলেন না। বললেন, দীপার স্বামী বেঁচে আছে এবং দীপার একটা মেয়েও আছে। একুশ বছরের টগবগে যুবতী নাকি মেয়েটা, সানথিয়া মেয়েটার নাম।
এক ঘন্টার দীর্ঘ কথাবার্তার পর জ্যাক চলে গেলেন। যাবার আগে বললেন, দীপার মেয়ে সানথিয়ারও খবর নিয়েছেন তিনি। সানথিয়া কোনো একটা এনজিওতে নাকি ছোটখাটো একটা চাকরি করে। একবার সানথিয়াকে দেখতে যাবার ইচ্ছের কথা জানালেন আমাকে।
একটু আগে জ্যাকের ফোন পেলাম। পরপর দুইবার। বই পড়ছিলাম বলে প্রথমবার ফোন রিসিভ করলাম না। এড়িয়ে গেলাম। দ্বিতীয়বারে রিসিভ করলাম। আমি 'হ্যালো' বলতেই, উচ্ছ্বসিত জ্যাক বললেন, 'সানথিয়ার সাথে আজ দেখা করে আসলাম। ওর কর্মস্থলে। কথাটথা হয়নি অবশ্য। কীইবা বলবো! সে তো আর চিনবে না আমাকে! ভাবছি আগামী রোববার আরেকবার যাবো তাকে দেখতে। তুমি কি রোববারে আমার সাথে যেতে রাজি আছো?'
আমি হ্যাঁ বা না কিছুই বললাম না। বললাম, 'দেখি।' বলে ফোন রেখে দিলাম।
খুব ব্যস্ত মানুষ আমি। কাউকে কোথাও যাবার কথা দিলে, সেই কথা রাখা হয়ে উঠে না। তাই সাবধানী উত্তর দিই আজকাল। কিন্তু কেন জানি না, এই মুহূর্তে আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছে, জ্যাককে আমি আবার ফোনব্যাক করি। করে বলি, 'হ্যাঁ আমি আপনার সাথে যাবো। আপনার প্রিয় মানবী দীপার মেয়ে সানথিয়াকে দেখতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে আমারও।'
এমন ইচ্ছের কোনো মানে আছে কিনা জানি না। সানথিয়াকে দেখে আমি কি পরখ করে নিতে চাইছি যে, একুশ বছরের দীপা তার মেয়ে সানথিয়ারই মতো দেখতে ছিলেন কিনা!
একটা সামাজিক সংগঠনের এক অনুষ্ঠানে জ্যাকের সাথে আমার পরিচয় হয়। বয়স ষাটের কাছাকাছি, কিন্তু দেখতে চল্লিশের বেশি মনে হয় না। খাওয়াদাওয়া ও নিয়মিত শরীরচর্চাই এর রহস্য হয়তো। একটানা পঁচিশ বছর ধরে আমেরিকায় থেকে অতিসম্প্রতি দেশে এসেছেন তিনি। মূলত তাঁর নাম জাকির, আমেরিকায় গিয়ে সেই নাম 'জ্যাক' হয়ে গেছে। তিনি অবশ্য জ্যাক নামেই পরিচয় দিতে নাকি বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। পঁচিশ বছরের নিয়ম, এতো সহজে ভুলবারও নয়।
আমি জনপ্রতিনিধি শুনে তিনি আমার ফোন নাম্বারটা যেচে চেয়ে নিলেন। বললেন, আপাতত কিছুদিন দেশে থাকবেন তিনি, কোনো দরকারে যদি আমার প্রয়োজন পড়ে, এই জন্যই নাম্বারটা নিয়ে রাখা।
সেদিনের পর প্রায়ই ফোন করেন তিনি। যদিও দরকারি কাজে ফোন দেওয়ার কথা থাকলেও, ফোনে তিনি দরকারি তেমন কিছুই বলেন না। 'কেমন আছো?' 'কী করছো?' জাতীয় কথার বাইরে আর কথা এগোয় না।
ক'দিন আগে আমার বাসায় এসেছেন একবার। বন্ধের দিন ছিলো বলে আমি ফ্রি ছিলাম। ঘন্টাখানেক ছিলেন। ওইদিন তিনি বিদেশ যাবার আগের, তাঁর যুবক বয়সের গল্প বললেন সবটা সময়। তখন নাকি দীপা নামে একজনের সাথে প্রেম ছিলো তাঁর। দীপা মেয়েটাও ভালোবাসতেন তাঁকে। বছর দুয়েকের পরে দেশে ফিরে এসে দীপাকে বিয়ে করে আমেরিকায় নিয়ে যাবেন ভেবে রেখেছিলেন। কিন্তু জ্যাক আমেরিকায় যাবার এক বছর পরেই দীপার অন্যত্র বিয়ে হয়ে যায়। রাগে ও দুঃখে জ্যাক তাই আর দেশে আসেননি। পঁচিশটা বছর তিনি কাটিয়ে দিলেন আমেরিকাতেই।
জ্যাক কিছুটা উদাস হয়ে বললেন, 'বিয়ে না করলেও, আমেরিকাতে বেশ কয়েকটা মেয়ের সাথে লিভিং টুগেদার করেছি আমি। ওদেশে এইসব ডালভাত।' একটু থেমে ঘরের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তবে সত্যি কি জানো, এতো এতো মেয়ের ঘনিষ্ঠ সাহচর্য পেয়েছি, দীপার কাছে গেলে যেমন সব গ্লানি ও তুচ্ছতা ভুলে যাওয়া যেতো--এই জীবনে তা অন্য কোনো নারীর মধ্যেই আমি পাইনি। কী বিচিত্র, তাই না!'
জানালেন, দেশে এসে তিনি প্রথমেই দীপার খুঁজ করেছেন। জেনেছেন দীপা বেঁচে নেই। কীভাবে দীপার মৃত্যু হয়েছে, সেই ডিটেইলসে তিনি গেলেন না। বললেন, দীপার স্বামী বেঁচে আছে এবং দীপার একটা মেয়েও আছে। একুশ বছরের টগবগে যুবতী নাকি মেয়েটা, সানথিয়া মেয়েটার নাম।
এক ঘন্টার দীর্ঘ কথাবার্তার পর জ্যাক চলে গেলেন। যাবার আগে বললেন, দীপার মেয়ে সানথিয়ারও খবর নিয়েছেন তিনি। সানথিয়া কোনো একটা এনজিওতে নাকি ছোটখাটো একটা চাকরি করে। একবার সানথিয়াকে দেখতে যাবার ইচ্ছের কথা জানালেন আমাকে।
একটু আগে জ্যাকের ফোন পেলাম। পরপর দুইবার। বই পড়ছিলাম বলে প্রথমবার ফোন রিসিভ করলাম না। এড়িয়ে গেলাম। দ্বিতীয়বারে রিসিভ করলাম। আমি 'হ্যালো' বলতেই, উচ্ছ্বসিত জ্যাক বললেন, 'সানথিয়ার সাথে আজ দেখা করে আসলাম। ওর কর্মস্থলে। কথাটথা হয়নি অবশ্য। কীইবা বলবো! সে তো আর চিনবে না আমাকে! ভাবছি আগামী রোববার আরেকবার যাবো তাকে দেখতে। তুমি কি রোববারে আমার সাথে যেতে রাজি আছো?'
আমি হ্যাঁ বা না কিছুই বললাম না। বললাম, 'দেখি।' বলে ফোন রেখে দিলাম।
খুব ব্যস্ত মানুষ আমি। কাউকে কোথাও যাবার কথা দিলে, সেই কথা রাখা হয়ে উঠে না। তাই সাবধানী উত্তর দিই আজকাল। কিন্তু কেন জানি না, এই মুহূর্তে আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছে, জ্যাককে আমি আবার ফোনব্যাক করি। করে বলি, 'হ্যাঁ আমি আপনার সাথে যাবো। আপনার প্রিয় মানবী দীপার মেয়ে সানথিয়াকে দেখতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে আমারও।'
এমন ইচ্ছের কোনো মানে আছে কিনা জানি না। সানথিয়াকে দেখে আমি কি পরখ করে নিতে চাইছি যে, একুশ বছরের দীপা তার মেয়ে সানথিয়ারই মতো দেখতে ছিলেন কিনা!

Comments
Post a Comment