মস্তিষ্কের খেলা
শহিদুল ইসলাম আকাশ
ছেলেবেলায় সপ্তাহান্তে এক নাপিত আসতেন বাড়িতে। বাড়ির উঠোনে চেয়ার পেতে চুল কাটার কাজে লেগে যেতেন তিনি। আশপাশের অনেক পরিবারের শিশুকিশোরেরাও লাইন ধরে বসে থাকতো, চুল কাটার আশায়। একে একে সবার চুল কেটে দিতেন তিনি। নাপিতের ভালো নাম কী জানা নেই, সবাই তাকে 'ফইরা' নামে ডাকতো। বয়সের ভারে কুঁজো হয়ে গেছেন, তবু চুল কাটায় তাঁর দক্ষতা ছিলো বেশ।
বাচ্চাছেলে আমরা, চুল কাটতেই ছিলো যতো অনীহা। কান্নাকাটি করতাম। তিনি দুষ্টুমি করে বলতেন, 'মাথাটা রেখে চলে যাও, আমি চুল কেটে রেখে যাবো।' তাতেও কাজ না-হলে সুর তুলে তখন বলে উঠতেন--
'অ, আ--
দক্ষিণে দরিয়া;
ই, ঈ--
উত্তরে খিড়কি।'
তাই শুনে সুবোধ বালকটি হয়ে চেয়ারে বসে থাকতাম। কান্না থেমে যেতো একসময়। তিনি যত্ন নিয়ে চুল কাটা শুরু করতেন। কল্পনায় তখন দক্ষিণের দরিয়ার উথালপাতাল ঢেউ দেখতাম, বহুদূর থেকে ভেসে যে ঢেউ হঠাৎ কূলে এসে ভেঙে পড়ে, উত্তরের জানালা দিয়ে ছুঁয়ে দিতো প্রিয়তম উত্তুরে হাওয়া, কল্পনায় সে হাওয়া গায়ে মেখে নিতাম--এক পরম সুগন্ধি আবেশে।
মাঝেমধ্যে চুল কাটতে কাটতে নানান গল্পও বলে যেতেন। একদিনের কথা মনে পড়ছে। আমি কিছুতেই চুল কাটবো না, কান্না শুরু করে দিলাম। তিনি আমাকে কাছে টেনে নিয়ে বললেন, 'আচ্ছা যাও, আজ চুল কাটা বাদ। আসো তোমাকে বাঘ ও হরিণের একটা গল্প বলি।'
সেই ছেলেবেলা থেকেই গল্পের প্রতি আমার তীব্র আগ্রহ ছিলো। তিনি আমাকে চেয়ারে বসালেন, তারপর গল্প বলা শুরু করে দিলেন--'ভীষণ গরমের কাল। একটা হরিণের খুব পানির তৃষ্ণা পেলো। হরিণ গেছে নদীতে পানি খেতে। হরিণ পানি খাচ্ছে, এমন সময় আড়াল থেকে একটা শিকারী বাঘ খপ করে হরিণটাকে ধরে ফেললো। আমাদের যেমন পোলাওবিরানী, বাঘের পোলাওবিরানী হলো হরিণ। আস্ত হরিণটাকে খেয়ে ফেললো বাঘটা।'
ফইরা কাকুর কেঁচি ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে চলেছে, গল্পের ফাঁকেফাঁকে তিনি যে আমার চুল কাটছেন হঠাৎ খেয়াল হলো। তিনি বললেন, 'হরিণটা কেমন বোকা দেখলে, এভাবে কেউ পানি খেতে আসে! পানি খেতে এসে নিজের জীবনটাই গেলো!'
এবার আমি কথা বলে উঠলাম, 'বলেন কী! হরিণটার তৃষ্ণা লাগছে, তাই বলে সে কি পানি খেতে পারবে না!'
আমার কথা শুনে বিস্মৃত হওয়ার ভঙ্গিতে তিনি মাথায় হাত রাখলেন, বললেন, 'তাও তো ঠিক। তোমার বুদ্ধি ভালো।'
তিনি চুল কাটা সমাপ্ত করলেন। আমার গায়ে জড়ানো কালোরঙের পাতলা কাপড়টা খুলতে খুলতে বিড়বিড় করে তাঁর নিজের বানানো সেই ছড়াটা বলতে লাগলেন আবার--
'অ, আ--
দক্ষিণে দরিয়া;
ই, ঈ--
উত্তরে খিড়কি।'
এইসব সেই কতোকাল আগের কথা! নাপিত ফইরা কাকুও মারা গেছেন সেই কতোকাল আগে! কিন্তু এখনো প্রতিবার চুলদাড়ি কাটতে গেলে কেন জানি তাঁর কথা মনে পড়ে আমার, আমারই অজান্তে। আমি তখন দেখি, কেঁচি, চিরুনি ও ক্ষুর হাতে এক অশীতিপর বৃদ্ধ আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, বয়সের ভারে কুঁজো শরীর তাঁর। তখন স্পষ্টত শুনি, তিনি থেমে থেমে বলছেন এই এক ছড়া--
'অ, আ...'
মানবদেহে মস্তিষ্ক ব্যাপারটাই কেমন যেন গোলমেলে। মস্তিষ্ক অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মুছে ফেলে সহজেই, আবার অতি তুচ্ছ কোনো বিষয়কে খুব যতনে সংরক্ষণ করে রাখে। সারাটা জীবন ধরে।


Comments
Post a Comment