বিবেক
শহিদুল ইসলাম আকাশ
১.
অজিত বাবু দীর্ঘ চল্লিশ বছর পর নিজের গ্রামে এসেছেন। রাতে খাবারদাবার সেরে তিনি শৈশবকালের বন্ধু বিজয় বাবুর সাথে দেখা করতে ছুটলেন।
২.
অজিত বাবু বড় ডাক্তার। অজিত বাবুর বন্ধু বিজয় বাবু ডাক্তার তো নয়ই, অজিত বাবুর মতো অতো বড় বড় ডিগ্রিও বিজয় বাবুর নেই। বিজয় বাবু ছাপোষা কেরানি। ছোটবেলা থেকে একসাথে হেসেখেলে বেড়ে উঠেছেন দু'জনে।
এমবিবিএস করার পর কিছুদিন অজিত বাবু গ্রামে ছিলেন, সেই সময় স্থানীয় বাজারে একটা চেম্বারও খুলে বসেছিলেন, প্রতিদিন দুইবেলা রোগী দেখতেন। গ্রামের প্রথম এমবিবিএস ডাক্তার, রোগী আসতো পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলো থেকেও। রোগীদের কাছ থেকে ফি নিতেন চড়া, বলতেন, 'মাগনায় ডাক্তার হইনি, অনেক টাকা খরচ করতে হয়েছে এই ডাক্তারির পেছনে।'
সেই সময়ের কথা। এক রাতে ঠেলাগাড়ি চালক রহিম মিয়ার যুবক ছেলেটার গায়ে কঠিন জ্বর উঠলো। মধ্যরাত। রহিম মিয়া অজিত বাবুর শরণাপন্ন হলেন। এতো রাতে অজিত বাবুর ঘুম ভাঙানোতে ভীষণ রেগে গেলেন অজিত বাবু। তারপর বললেন, 'আমার ফি কতো জানো? দিতে পারবে তো?' রহিম মিয়া বললো, 'ঘরে একটা টাকাও নাই। পরে আপনাকে ফি আমি শোধ করে দেবো। এখন দয়া করে চলেন, আমার ছেলেটাকে বাঁচান।' অজিত বাবু 'আমি বাকিতে রোগী দেখি না' বলে ঘরের দরোজা বন্ধ করে দিলেন।
চিকিৎসা না-পেয়ে প্রচণ্ড জ্বরের মধ্যে রহিম মিয়ার অসুস্থ ছেলেটার সেদিন শেষ রাতে মৃত্যু হয়। রহিম মিয়ার ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরও অজিত বাবুর কোনো ভাবান্তর হলো না। যেন মৃত্যু একটি স্বাভাবিক বিষয়, বিশেষ করে ডাক্তারেরা এতে বিচলিত হলে চলে না। এমন অনেক উদাহরণ অজিত বাবুর ডাক্তারি জীবনে আছে।
৩.
চল্লিশ বছর পর অজিত বাবু গ্রামে এসে বন্ধু বিজয় বাবুর কাছে যাচ্ছিলেন। গ্রামের অন্ধকার নিস্তব্ধ পথ ধরে হাঁটছিলেন। হঠাৎ এক জায়গায় এসে থামতে হলো অজিত বাবুকে। তিনি দেখলেন অন্ধকারের মধ্যে থেকে একটি যুবক এগিয়ে আসতে লাগলো তার দিকে, আসতে আসতে যুবক অজিত বাবুর নাম ধরে ডাকলো, 'অজিত বাবু, কেমন আছেন? আমাকে চেনেন?' বিড়বিড় করে অজিত বাবু বললেন, 'কে-এএ, কে, কে তুমি!' যুবক বললো, 'আমার নাম আজিজ, রহিম মিয়ার ছেলে।' তারপর বললো, 'এখনো কি রোগীর কাছ থেকে চড়া ফি নেন? এতো টাকা দিয়ে কী করবেন? মৃত্যুর পরের জগতে এই টাকা তো কোনোই কাজে আসে না।' চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় আগে একদিন মধ্যরাতে রহিম মিয়া তাঁর অসুস্থ সন্তানের চিকিৎসার জন্য অজিত বাবুর কাছে ছুটে এসেছিলেন, সেই কথা স্পষ্ট মনে পড়লো অজিত বাবুর।
অজিত বাবু চারপাশে ভালো করে চোখ বুলালেন, দেখলেন, রাস্তার ঠিক পাশেই একটা কবরস্থান। ভয়ে তিনি থরথর করে কাঁপতে লাগলেন।
বিজয় বাবুর কাছে গিয়ে, তিনি বিজয় বাবুকে জাপটে জড়িয়ে ধরলেন, ধরে হু হু করে কাঁদতে লাগলেন। আসার পথে ঘটা ঘটানাটা খুলে বললেন বিজয় বাবুকে।
বিজয় বাবু বন্ধুকে চেয়ারে বসালেন, বললেন, 'ওটা রহিম মিয়ার ছেলে না, তুমি তো অনেক বড় ডাক্তার, তোমার তো তা বুঝার কথা।'
'তাহলে ওটা কে?' অজিত বাবুর বিস্ময়াভিভূত প্রশ্ন।
একটু হাসলেন বিজয় বাবু, হাসতে হাসতে বললেন, 'ওটা তোমার বিবেক। যে বিবেকটাকে তুমি নিজেই এতোকাল ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিলে।'
অজিত বাবু বন্ধু বিজয় বাবুর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। মনে মনে তিনি নিজেকে নিজেই বললেন, 'সত্যিই কি তাই!'
১.
অজিত বাবু দীর্ঘ চল্লিশ বছর পর নিজের গ্রামে এসেছেন। রাতে খাবারদাবার সেরে তিনি শৈশবকালের বন্ধু বিজয় বাবুর সাথে দেখা করতে ছুটলেন।
২.
অজিত বাবু বড় ডাক্তার। অজিত বাবুর বন্ধু বিজয় বাবু ডাক্তার তো নয়ই, অজিত বাবুর মতো অতো বড় বড় ডিগ্রিও বিজয় বাবুর নেই। বিজয় বাবু ছাপোষা কেরানি। ছোটবেলা থেকে একসাথে হেসেখেলে বেড়ে উঠেছেন দু'জনে।
এমবিবিএস করার পর কিছুদিন অজিত বাবু গ্রামে ছিলেন, সেই সময় স্থানীয় বাজারে একটা চেম্বারও খুলে বসেছিলেন, প্রতিদিন দুইবেলা রোগী দেখতেন। গ্রামের প্রথম এমবিবিএস ডাক্তার, রোগী আসতো পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলো থেকেও। রোগীদের কাছ থেকে ফি নিতেন চড়া, বলতেন, 'মাগনায় ডাক্তার হইনি, অনেক টাকা খরচ করতে হয়েছে এই ডাক্তারির পেছনে।'
সেই সময়ের কথা। এক রাতে ঠেলাগাড়ি চালক রহিম মিয়ার যুবক ছেলেটার গায়ে কঠিন জ্বর উঠলো। মধ্যরাত। রহিম মিয়া অজিত বাবুর শরণাপন্ন হলেন। এতো রাতে অজিত বাবুর ঘুম ভাঙানোতে ভীষণ রেগে গেলেন অজিত বাবু। তারপর বললেন, 'আমার ফি কতো জানো? দিতে পারবে তো?' রহিম মিয়া বললো, 'ঘরে একটা টাকাও নাই। পরে আপনাকে ফি আমি শোধ করে দেবো। এখন দয়া করে চলেন, আমার ছেলেটাকে বাঁচান।' অজিত বাবু 'আমি বাকিতে রোগী দেখি না' বলে ঘরের দরোজা বন্ধ করে দিলেন।
চিকিৎসা না-পেয়ে প্রচণ্ড জ্বরের মধ্যে রহিম মিয়ার অসুস্থ ছেলেটার সেদিন শেষ রাতে মৃত্যু হয়। রহিম মিয়ার ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরও অজিত বাবুর কোনো ভাবান্তর হলো না। যেন মৃত্যু একটি স্বাভাবিক বিষয়, বিশেষ করে ডাক্তারেরা এতে বিচলিত হলে চলে না। এমন অনেক উদাহরণ অজিত বাবুর ডাক্তারি জীবনে আছে।
৩.
চল্লিশ বছর পর অজিত বাবু গ্রামে এসে বন্ধু বিজয় বাবুর কাছে যাচ্ছিলেন। গ্রামের অন্ধকার নিস্তব্ধ পথ ধরে হাঁটছিলেন। হঠাৎ এক জায়গায় এসে থামতে হলো অজিত বাবুকে। তিনি দেখলেন অন্ধকারের মধ্যে থেকে একটি যুবক এগিয়ে আসতে লাগলো তার দিকে, আসতে আসতে যুবক অজিত বাবুর নাম ধরে ডাকলো, 'অজিত বাবু, কেমন আছেন? আমাকে চেনেন?' বিড়বিড় করে অজিত বাবু বললেন, 'কে-এএ, কে, কে তুমি!' যুবক বললো, 'আমার নাম আজিজ, রহিম মিয়ার ছেলে।' তারপর বললো, 'এখনো কি রোগীর কাছ থেকে চড়া ফি নেন? এতো টাকা দিয়ে কী করবেন? মৃত্যুর পরের জগতে এই টাকা তো কোনোই কাজে আসে না।' চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় আগে একদিন মধ্যরাতে রহিম মিয়া তাঁর অসুস্থ সন্তানের চিকিৎসার জন্য অজিত বাবুর কাছে ছুটে এসেছিলেন, সেই কথা স্পষ্ট মনে পড়লো অজিত বাবুর।
অজিত বাবু চারপাশে ভালো করে চোখ বুলালেন, দেখলেন, রাস্তার ঠিক পাশেই একটা কবরস্থান। ভয়ে তিনি থরথর করে কাঁপতে লাগলেন।
বিজয় বাবুর কাছে গিয়ে, তিনি বিজয় বাবুকে জাপটে জড়িয়ে ধরলেন, ধরে হু হু করে কাঁদতে লাগলেন। আসার পথে ঘটা ঘটানাটা খুলে বললেন বিজয় বাবুকে।
বিজয় বাবু বন্ধুকে চেয়ারে বসালেন, বললেন, 'ওটা রহিম মিয়ার ছেলে না, তুমি তো অনেক বড় ডাক্তার, তোমার তো তা বুঝার কথা।'
'তাহলে ওটা কে?' অজিত বাবুর বিস্ময়াভিভূত প্রশ্ন।
একটু হাসলেন বিজয় বাবু, হাসতে হাসতে বললেন, 'ওটা তোমার বিবেক। যে বিবেকটাকে তুমি নিজেই এতোকাল ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিলে।'
অজিত বাবু বন্ধু বিজয় বাবুর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। মনে মনে তিনি নিজেকে নিজেই বললেন, 'সত্যিই কি তাই!'

Comments
Post a Comment