ভালোবাসা, এই একটি শব্দ

শহিদুল ইসলাম আকাশ

মধ্যরাতে রুবিনা আমার বাসায় এসে হাজির। তার স্বামীকে একটু আগে পুলিশে ধরে নিয়ে গেছে, তাই আমার সাহায্য চাইতে এসেছে। খুব কান্নাকাটি করছে সে, বললো, তার স্বামী ডায়াবেটিকসের রোগী, কঠিন নিয়মের মধ্যে থাকতে হয় তাকে। আমি বসতে দিলাম। 'দেখি কী করা যায়' বলে আশ্বস্ত করলাম রুবিনাকে।

থানায় ফোন দিলাম। দায়িত্বরত অফিসার জানালেন, রুবিনার স্বামী পরোয়ানাভুক্ত আসামী। আমার পরিচয় জেনে বললেন, 'মামলা তেমন জটিল কিছু না, প্রতিবেশীর সাথে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের মামলা। সকালে আদালতে সোপর্দ করা হবে, সেখান থেকে জামিন নেওয়া কঠিন কিছু হবে না।' আমি পুলিশ অফিসারটিকে ধন্যবাদ দিয়ে ফোন রেখে দিলাম।

রুবিনাকে বললাম, 'আমার পরিচিত এক উকিলের নাম্বার দিচ্ছি, উনার সাথে যোগাযোগ করে জামিনের ব্যবস্থা করে নিও।' সাহস দিলাম তাকে, বললাম, 'জামিন হয়ে যাবে, তুমি চিন্তা করো না।'

আমার এমন কথাতেও রুবিনা আশ্বস্ত হলো বলে মনে হলো না, সে কেঁদেই যাচ্ছে। কাঁদতে কাঁদতে বললো, সে এখনই থানায় যেতে চায় এবং স্বামীর ঔষধপত্র সাথে নিয়ে যাবে। বললাম, 'যেতে পারবে। আমি থানায় ফোন করে দিচ্ছি।'

মধ্যরাতে রুবিনার এই কান্না আমাকে নতুন এক প্রশ্নের সম্মুখীন করলো হঠাৎ। আট বছর আগের এমনই এক রাতের কথা মনে পড়ে গেলো। সেদিনও এই রুবিনাই এমন উজাড় করে কেঁদেকেটে অস্থির হয়ে গিয়েছিলো।

তখন জনপ্রতিনিধি হিসেবে সবে শপথ নিয়েছি বলা যায়। আট বছর আগে এমনই এক মধ্যরাতে রুবিনা আমার কাছে আসে। কী কাকতালীয় মিল!

সেদিনও রুবিনা এমনই খুব করে কেঁদেছিলো, সুমন নামের কোনো এক ছেলেকে রুবিনা ভালোবাসে, সে ছেলেকে ছাড়া সে বাঁচবে না, কিন্তু রুবিনার পরিবার অন্যত্র রুবিনার বিয়ের সব বন্দোবস্ত করে ফেলেছে। কাঁদতে কাঁদতে রুবিনা সেদিন বলেছিলো, আমি যেন কিছু একটা করি যাতে এই বিয়ে কিছুতেই না-হয় আর সুমন নামের ছেলেটার সাথেই যেন রুবিনার বিয়েটা হয়।

সেবার আমি কোনো সাহায্যই করতে পারিনি তাকে। পরিবারের পছন্দের ছেলেটার সাথে বিয়ে হয়ে যায় রুবিনার। একদিন সুমন নামের প্রেমিকের জন্য রুবিনার যে ভালোবাসা দেখেছি, আজ অনিচ্ছায় বিয়ে হওয়া স্বামীটির জন্যও একই ভালোবাসা দেখে অবাকই হলাম। ভালোবাসার সংজ্ঞা আসলে কী?

রুবিনা চলে গেলো। যাবার সময় কৌতূহলে রুবিনাকে থামালাম, রুবিনা তখনো কাঁদছে, দু'চোখ বেয়ে অবিরত গড়িয়ে পড়ছে জল, বললাম, 'সুমনের কথা মনে আছে তোমার?' আমার এমন প্রশ্নের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলো না সে, কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে কিছু না-বলেই দ্রুত চলে গেলো।

মনে মনে বললাম, 'ভালোবাসা' নামের এই একটি শব্দ কেমন যেন গোলমেলে--এই পৃথিবীতে কতো রহস্যেরই-না জট খুলেছে মানুষ, ভালোবাসার রহস্যময়তার জট খুলবার মতো ক্ষমতা মানুষ এখনো পুরোপুরি রপ্ত করতে পারেনি। পারবেও কি?

ভুল বললাম হয়তো, হয়তো রপ্ত হয়েছে পুরোটাই--শরীরে বিভিন্ন অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মতো ভালোবাসাও প্রতিস্থাপন করা শিখে গেছে মানুষ। নাই যদি হবে তো স্বামীর জন্য রুবিনার এই উৎকণ্ঠা কীইবা অর্থ বহন করে?   

Comments

Popular Posts