দূর অনন্তের দেশ থেকে
শহিদুল ইসলাম আকাশ
'সে এক দিগদারী কাণ্ড।' লাশবাহী গাড়ির চালক মোশারফ নামের মধ্যবয়সী পুরুষের এমন কথায় আমি সেই 'দিগদারী কাণ্ড' শুনতে আগ্রহী হলাম।
এক পরিচিতের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর, সেখানে গেলে মোশারফের সাথে দেখা হয়। রাত একটু গভীর হলে মৃতের বাড়ির ভিড়ভাট্টা কমতে শুরু করে, পরদিন সকাল দশটায় জানাজা, অনেকেই ঘুমাতে চলে গেছে। আমি তখনো বসে আছি। বাড়ির উঠোনে মুখোমুখি দুটি চেয়ারে বসে আমি মোশারফের সাথে কথা বলে যেতে লাগলাম। 'কী নাম', 'কতোদিন থেকে এই পেশায়', 'বাড়ি কোথায়'--ইত্যকার প্রশ্ন করতে লাগলাম তাকে। সে কিছুটা ইতস্তত, বললো, 'আপনে কে? এতো কথা জিগাইতেছেন ক্যান?' শুরুতেই সে আমাকে সাংবাদিক ভেবে বসেছিলো, পরে আমি বুঝিয়ে বলার পর সে বুঝলো যে, আমি মানুষের জীবনযাপন নিয়ে গল্প লিখি। সাংবাদিক না। জেনে বললো, 'আমারে নিয়াও গল্প লিখবেন নাকি?' বললাম, 'লিখতেও পারি।'
লাশ নিয়ে দেশের এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ছুটতে হয় তাকে, এই নিয়ে বিচিত্র কোনো অভিজ্ঞতা তার আছে কিনা--জানতে চাইলাম যখন, তখন সে তার 'দিগদারী কাণ্ড' বলা শুরু করলো।
মোশারফ বললো, 'দশ বৎসর আগের কথা। একবার হইছে কি, এক গ্রামের রাস্তা দিয়া লাশ নিয়ে যাইতাছি। মাঘ মাসের শীতের কাল। গাড়িত লাশের আত্মীয়স্বজন কেউ নাই। আমি আর শুধুই ওই লাশ। রাত দুইটা তহন। হঠাৎ দেখি, লাশটা উইঠা বইছে, টাইনা টাইনা আমার নাম ধইরা ডাকলো, 'মো-শা-র-ফ!' শুইনা আমি তো ভয়ে অস্থির। পিছনে তাকাইয়া দেখি, মাঘ মাসের শীতের মইধ্যেও লোকটা ঝরঝর কইরা ঘামতাছে।'
এইটুকু শুনে আমি শুনার আগ্রহ হারিয়ে ফেললাম। মোশারফ তা বুঝলো, বললো, 'কী ভাইজান বিশ্বাস হইতেছে না'? অনিচ্ছাসত্ত্বেও বললাম, 'বিশ্বাস না-হওয়ার কী আছে? তারপর...'
'তারপর ভাইজান লোকটা কইলো, 'মরিয়ম তো এহনো তোমার লাইগা পাগল। তোমার ভেতর এমন কী আছে যার লাগি এমন সুন্দরী একটা মাইয়া এমন দিওয়ানা হইলো?''
এই পর্যায়ে আবার আমার আগ্রহ তৈরি হলো, জানতে চাইলাম, 'মরিয়মটা কে?' মোশারফ একটু লজ্জা পেলো যেন, বললো, 'আমার বিবাহিত স্ত্রী। পাঁচ বৎসরের সংসার। কোনো ছেলেপুলে হইতেছিলো না। এইটা নিয়ে সবসময় মন খারাপ করতো সে। আমি বুঝাইতাম, ছেলেপুলে পালাইয়া যাইতাছে না, সময় হলে হইবো। কিন্তু মরিয়ম বুঝবার চাইতো না। একবার লাশ নিয়ে রাজশাহী যাইতে হইলো আমার, তিনদিনের পথ। তহন এক রাইতে মরিয়ম আত্মহত্যা কইরা বইলো!'
আমি আবার লাশের উঠে বসার প্রসঙ্গে ফিরে গেলাম, 'মরিয়মকে নিয়ে জেগে উঠা লাশটা আর কী বললো?' মোশারফ বললো, 'আমি ভয় পাইতেছিলাম, এই লোক আমার আর মরিয়মের নাম জানলো ক্যামনে! জিঘাইলাম তারে, 'মরিয়মের লগে আপনার দেখা হইছে?' লোকটা হাসি দিয়া কইলো, 'দেখা হইবো না, কও কি? এহন আমি যে জগতে আছি, এইখানে সবার লগে সবার দেখা হয়।' শুনে কইলাম, 'মরিয়ম এহন কেমন আছে?' লোকটা কইলো, 'ভালো নাই, তোমারে ছাড়া সেও বিদিশার মইধ্যে আছে।''
'তারপর...' আমার উৎসুক আহবান। মোশারফ বললো, 'এরপরই লোকটা আবার শুইয়া পড়লো। অনেক ডাকাডাকি করলাম তারপরও সাড়া নাই কোনো। পরদিন রাইতে মরিয়মরে স্বপ্নে দেখলাম, একখান নীল রঙের শাড়ি পরা, শাড়িতে ওরে পরীর লাহান সুন্দর লাগছিলো। মরিয়ম আমারে কইলো, 'তুমি আবার বিয়া করো না ক্যান? বিয়া করো, বিয়ার পর তোমার টুকটুকে একটা মাইয়া হইবো, সেই মাইয়ার নাম রাখমু আমি। ওর নাম দিবা, বাবলী। মনে থাকবো তো?' শুনে আমি কইলাম, 'মনে থাকবো, বাবলী।''
একটুক্ষণ চুপ থাকলাম, লাশ উঠে বসার ঘটনাটা মোশারফের মস্তিষ্কের কোনো বিভ্রম। যা তার কাছে সত্যির মতো মনে হয়েছিলো তখন। কিন্তু তবু মোশারফের কথা শুনার আগ্রহ আর কমলো না আমার, বললাম, 'আবার বিয়ে কি করা হয়েছিলো?' মোশারফ বললো, 'হ করছি। মরিয়মের কথাই ঠিক হইছে, আমার একটা মাইয়া হইলো বিয়ের পরের বৎসরই। সেই মাইয়ার বয়স এহন পাঁচ বৎসর।' শুনে বললাম, 'কী নাম মেয়ের?' ঠোঁটের কোণায় হাসি রেখেই মোশারফ বললো, 'বাবলী।'
মৃত্যুর পর মৃতকে আমরা 'লাশ' বলি, ডাক্তাররা বলেন, 'বডি' বা 'ডেডবডি', মেডিকেলের শিক্ষার্থীরা যখন মৃতদেহ কেটেছেটে পরীক্ষা করেন, তখন তাকেই আবার বলা হয়, 'সাবজেক্ট'। কিন্তু মোশারফের কথা শুনে মনে হলো, আমরা জীবিতরা কী নির্বোধ, মৃত্যুর পরে 'লাশ' 'বডি' বা 'ডেডবডি' অথবা 'সাবজেক্ট'--যাই বলা হোক না কেন, মানুষ তবু মানুষই। মূলত মৃত্যুর পরেও জেগে থাকে কেউ কেউ, কোনো কোনো মানুষের মনে, স্মৃতিতে চিরঅম্লান হয়ে। জীবনে মৃত্যুর নিয়ম আছে, কিন্তু মৃত্যুই সবসময় শেষ কথা নয়।
আমি মোশারফের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে উঠলাম। বাসার দিকে ফিরছি, কিছুদূর এসে বাইক থামিয়ে দাঁড়ালাম একটু। সুনসান অন্ধকার রাত। জোছনা নেই, কিন্তু জোনাকি আছে। অন্ধকারে জোনাকির সোনালী-হলুদ ডানার নিদারুণ উড়াউড়ি দেখছি আর ভাবছি, মরিয়ম কি 'বাবলী' নামের বাচ্চামেয়েটাকে দেখতে পায়--দূর অনন্তের দেশ থেকে! যদি দেখে, তাহলে একটা সন্তানের তৃষিত আকাঙ্ক্ষা এতোদিনে মরিয়মেরও পূরণ হয়েছে নিশ্চয়!
'সে এক দিগদারী কাণ্ড।' লাশবাহী গাড়ির চালক মোশারফ নামের মধ্যবয়সী পুরুষের এমন কথায় আমি সেই 'দিগদারী কাণ্ড' শুনতে আগ্রহী হলাম।
এক পরিচিতের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর, সেখানে গেলে মোশারফের সাথে দেখা হয়। রাত একটু গভীর হলে মৃতের বাড়ির ভিড়ভাট্টা কমতে শুরু করে, পরদিন সকাল দশটায় জানাজা, অনেকেই ঘুমাতে চলে গেছে। আমি তখনো বসে আছি। বাড়ির উঠোনে মুখোমুখি দুটি চেয়ারে বসে আমি মোশারফের সাথে কথা বলে যেতে লাগলাম। 'কী নাম', 'কতোদিন থেকে এই পেশায়', 'বাড়ি কোথায়'--ইত্যকার প্রশ্ন করতে লাগলাম তাকে। সে কিছুটা ইতস্তত, বললো, 'আপনে কে? এতো কথা জিগাইতেছেন ক্যান?' শুরুতেই সে আমাকে সাংবাদিক ভেবে বসেছিলো, পরে আমি বুঝিয়ে বলার পর সে বুঝলো যে, আমি মানুষের জীবনযাপন নিয়ে গল্প লিখি। সাংবাদিক না। জেনে বললো, 'আমারে নিয়াও গল্প লিখবেন নাকি?' বললাম, 'লিখতেও পারি।'
লাশ নিয়ে দেশের এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ছুটতে হয় তাকে, এই নিয়ে বিচিত্র কোনো অভিজ্ঞতা তার আছে কিনা--জানতে চাইলাম যখন, তখন সে তার 'দিগদারী কাণ্ড' বলা শুরু করলো।
মোশারফ বললো, 'দশ বৎসর আগের কথা। একবার হইছে কি, এক গ্রামের রাস্তা দিয়া লাশ নিয়ে যাইতাছি। মাঘ মাসের শীতের কাল। গাড়িত লাশের আত্মীয়স্বজন কেউ নাই। আমি আর শুধুই ওই লাশ। রাত দুইটা তহন। হঠাৎ দেখি, লাশটা উইঠা বইছে, টাইনা টাইনা আমার নাম ধইরা ডাকলো, 'মো-শা-র-ফ!' শুইনা আমি তো ভয়ে অস্থির। পিছনে তাকাইয়া দেখি, মাঘ মাসের শীতের মইধ্যেও লোকটা ঝরঝর কইরা ঘামতাছে।'
এইটুকু শুনে আমি শুনার আগ্রহ হারিয়ে ফেললাম। মোশারফ তা বুঝলো, বললো, 'কী ভাইজান বিশ্বাস হইতেছে না'? অনিচ্ছাসত্ত্বেও বললাম, 'বিশ্বাস না-হওয়ার কী আছে? তারপর...'
'তারপর ভাইজান লোকটা কইলো, 'মরিয়ম তো এহনো তোমার লাইগা পাগল। তোমার ভেতর এমন কী আছে যার লাগি এমন সুন্দরী একটা মাইয়া এমন দিওয়ানা হইলো?''
এই পর্যায়ে আবার আমার আগ্রহ তৈরি হলো, জানতে চাইলাম, 'মরিয়মটা কে?' মোশারফ একটু লজ্জা পেলো যেন, বললো, 'আমার বিবাহিত স্ত্রী। পাঁচ বৎসরের সংসার। কোনো ছেলেপুলে হইতেছিলো না। এইটা নিয়ে সবসময় মন খারাপ করতো সে। আমি বুঝাইতাম, ছেলেপুলে পালাইয়া যাইতাছে না, সময় হলে হইবো। কিন্তু মরিয়ম বুঝবার চাইতো না। একবার লাশ নিয়ে রাজশাহী যাইতে হইলো আমার, তিনদিনের পথ। তহন এক রাইতে মরিয়ম আত্মহত্যা কইরা বইলো!'
আমি আবার লাশের উঠে বসার প্রসঙ্গে ফিরে গেলাম, 'মরিয়মকে নিয়ে জেগে উঠা লাশটা আর কী বললো?' মোশারফ বললো, 'আমি ভয় পাইতেছিলাম, এই লোক আমার আর মরিয়মের নাম জানলো ক্যামনে! জিঘাইলাম তারে, 'মরিয়মের লগে আপনার দেখা হইছে?' লোকটা হাসি দিয়া কইলো, 'দেখা হইবো না, কও কি? এহন আমি যে জগতে আছি, এইখানে সবার লগে সবার দেখা হয়।' শুনে কইলাম, 'মরিয়ম এহন কেমন আছে?' লোকটা কইলো, 'ভালো নাই, তোমারে ছাড়া সেও বিদিশার মইধ্যে আছে।''
'তারপর...' আমার উৎসুক আহবান। মোশারফ বললো, 'এরপরই লোকটা আবার শুইয়া পড়লো। অনেক ডাকাডাকি করলাম তারপরও সাড়া নাই কোনো। পরদিন রাইতে মরিয়মরে স্বপ্নে দেখলাম, একখান নীল রঙের শাড়ি পরা, শাড়িতে ওরে পরীর লাহান সুন্দর লাগছিলো। মরিয়ম আমারে কইলো, 'তুমি আবার বিয়া করো না ক্যান? বিয়া করো, বিয়ার পর তোমার টুকটুকে একটা মাইয়া হইবো, সেই মাইয়ার নাম রাখমু আমি। ওর নাম দিবা, বাবলী। মনে থাকবো তো?' শুনে আমি কইলাম, 'মনে থাকবো, বাবলী।''
একটুক্ষণ চুপ থাকলাম, লাশ উঠে বসার ঘটনাটা মোশারফের মস্তিষ্কের কোনো বিভ্রম। যা তার কাছে সত্যির মতো মনে হয়েছিলো তখন। কিন্তু তবু মোশারফের কথা শুনার আগ্রহ আর কমলো না আমার, বললাম, 'আবার বিয়ে কি করা হয়েছিলো?' মোশারফ বললো, 'হ করছি। মরিয়মের কথাই ঠিক হইছে, আমার একটা মাইয়া হইলো বিয়ের পরের বৎসরই। সেই মাইয়ার বয়স এহন পাঁচ বৎসর।' শুনে বললাম, 'কী নাম মেয়ের?' ঠোঁটের কোণায় হাসি রেখেই মোশারফ বললো, 'বাবলী।'
মৃত্যুর পর মৃতকে আমরা 'লাশ' বলি, ডাক্তাররা বলেন, 'বডি' বা 'ডেডবডি', মেডিকেলের শিক্ষার্থীরা যখন মৃতদেহ কেটেছেটে পরীক্ষা করেন, তখন তাকেই আবার বলা হয়, 'সাবজেক্ট'। কিন্তু মোশারফের কথা শুনে মনে হলো, আমরা জীবিতরা কী নির্বোধ, মৃত্যুর পরে 'লাশ' 'বডি' বা 'ডেডবডি' অথবা 'সাবজেক্ট'--যাই বলা হোক না কেন, মানুষ তবু মানুষই। মূলত মৃত্যুর পরেও জেগে থাকে কেউ কেউ, কোনো কোনো মানুষের মনে, স্মৃতিতে চিরঅম্লান হয়ে। জীবনে মৃত্যুর নিয়ম আছে, কিন্তু মৃত্যুই সবসময় শেষ কথা নয়।
আমি মোশারফের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে উঠলাম। বাসার দিকে ফিরছি, কিছুদূর এসে বাইক থামিয়ে দাঁড়ালাম একটু। সুনসান অন্ধকার রাত। জোছনা নেই, কিন্তু জোনাকি আছে। অন্ধকারে জোনাকির সোনালী-হলুদ ডানার নিদারুণ উড়াউড়ি দেখছি আর ভাবছি, মরিয়ম কি 'বাবলী' নামের বাচ্চামেয়েটাকে দেখতে পায়--দূর অনন্তের দেশ থেকে! যদি দেখে, তাহলে একটা সন্তানের তৃষিত আকাঙ্ক্ষা এতোদিনে মরিয়মেরও পূরণ হয়েছে নিশ্চয়!

Comments
Post a Comment