দাম
শহিদুল ইসলাম আকাশ
পিছন থেকে শরীয়ত ডাকলো আমাকে। সামনে এসে হেসে সালাম দিলো। বললাম, 'কী খবর শরীয়ত?'
শরীয়ত রিকশা চালায়। বছর-পঁচিশের কিছু বেশি হবে বয়স, ত্রিশের কম। নেত্রকোনা কি কিশোরগঞ্জে বাড়ি। গত পাঁচ বছর ধরে আমাদের এখানে রিকশা চালাচ্ছে সে। একবার রিকশার মালিকের সাথে শরীয়তের ঝামেলা বাঁধে, সেই ঝামেলা নিরসনে শরীয়ত আমার দ্বারস্থ হলে, তা মীমাংসায় আমার সামান্য ভূমিকা ছিলো। সেই থেকে শরীয়ত আমাকে দেখলেই ছুটে আসে। নিদেনপক্ষে একটা সালাম অন্তত দিয়ে যেতে ভুল করে না।
শরীয়ত বললো, 'ভালা আছি ভাইজান।' তারপর রীতিমত দৌঁড়ে গিয়ে পার্শ্ববর্তী এক মিষ্টির দোকান থেকে এক কেজি মতো মিষ্টি কিনে আমার হাতে ধরিয়ে দিলো, বললো, 'বাসায় ভাবীবাচ্চাদের দিবেন।' আমি ইতস্তত করতে লাগলাম, বললাম, 'মিষ্টি কেন?' শরীয়ত একটু যেন লজ্জিত হলো, বললো, 'গ্রামের বাড়িত থাইকা একটু আগে মোবাইল করছে, আমার একটা মাইয়া হইছে ভাইজান।' মনে পড়লো, বছর-দেড়েক আগে শরীয়ত বিয়ে করেছে, শরীয়তই আমাকে বলেছিলো তা। মিষ্টির প্যাকেটটা হাতে নিয়ে বললাম, 'তাই নাকি? বউ-মেয়ে কেমন আছে এখন?' 'দুইজনে ভালাই আছে', বললো শরীয়ত।
এরপর আমি 'আচ্ছা, ঠিক আছে' বলে সামনে এগোতেই, শরীয়ত আবার ডাকলো, 'ভাইজান।' আমি থামলাম, বললাম, 'কিছু বলবে?' শরীয়ত বললো, 'যদি কিছু মনে না-করেন, আমার মাইয়ার জন্য একটা নাম যদি আপনি দিতেন...। মোবাইলে বউ বলছে, একটা নাম দেওনের কথা।'
শরীয়তের কথায় কী মনে করে, আমি হঠাৎ বলে বসলাম, 'নাজমা নামটা রাখতে পারো। আগে ও পরে আর কিছু লাগাতে হলে সেটা তুমি ঠিক করে নিও।' শরীয়ত সাথে সাথে পকেট থেকে মোবাইল বের করে কাকে যেন ফোন দিলো, সম্ভবত ওর বউই হবে। বললো, 'এই শোনো, মাইয়ার নাম রাখবা নাজমা। মোছাম্মৎ নাজমা।'
বলতে বলতে শরীয়ত একটু আড়ালে চলে গেলো। বউয়ের সাথে আরো কিছু কথা হয়তো সে বলবে, আমার সামনে বলতে পারছে না। আমিও মিষ্টির প্যাকেটটা হাতে নিয়ে হাঁটতে লাগলাম।
হাঁটতে হাঁটতে ভাবলাম, এতো নাম থাকতে 'নাজমা' নামটাই হঠাৎ মনে আসলো কেন? তাছাড়া আমি কখনো এইসব নামধাম দিতে পারি না। নিজের সন্তানের নাম রাখতেও আমাকে অনেকটা সময় ভাবতে হয়েছিলো। আজ হঠাৎ, শরীয়ত যখন তার নবজাতক সন্তানের নাম দিতে বললো, আমি কোনোরকম ভাবনাচিন্তা ছাড়াই 'নাজমা' নামটাই-বা বললাম কেন!
মনে পড়লো, কলেজে এই নামে আমার এক সহপাঠিনী ছিলো। আমার এক বন্ধু সেই নাজমার প্রেমে পাগলপারা হয়ে ছিলো, কিন্তু নাজমা মেয়েটা তাকে কখনো পাত্তা দেয়নি। কী নিষ্ঠুর হৃদয়হীনের মতো উপেক্ষাই করে গেছে সবসময়। গতকাল, অনেক বছর পরে, আমার সেই বন্ধুটির সাথে দেখা হয়। দেখা হতেই, কুশল বিনিময় শেষে বন্ধু বলেছে, 'নাজমার কথা কি তোর মনে আছে?'
শরীয়ত শেষ পর্যন্ত আমার দেওয়া 'নাজমা' নামটা তার মেয়ের রাখে কিনা কে জানে! রাখতেও পারে। যদি রাখে, শরিয়তের মেয়েটাও একদিন যখন বড় হবে, তখন কোনো প্রেমিকপ্রবর তাকে হৃদয় উজাড় করে ভালোবাসলে, সেদিন সেই ভালোবাসার দাম যেন সে খুব করে দিতে পারে। মনে মনে ভাবছি। মনে মনেই।


Comments
Post a Comment