চোরপুলিশের খেলা

শহিদুল ইসলাম আকাশ

৯৫ বছর বয়স চলছে, তবু তিনি শারীরিক সক্ষম ব্যক্তি। নিয়মিত সাইকেল চালান, হাটে গিয়ে বাজার করেন, নিজের জমিতে খেতখামারের কাজও করেন দুইবেলা। স্ত্রী মারা গেছেন বিশ বছর আগে, চার ছেলে দুই মেয়ে। নাতিনাতনিদেরও অনেকের বিয়ে হয়ে ছেলেপুলে হয়েছে। মানুষটাকে দেখে রীতিমত অবাক হতে হলো।

আমজাদ আলী নাম তাঁর। গ্রাম আদালতের এক বিচারে বিচারকের দায়িত্বপালন করছিলাম, তিনি এসেছেন বাদীপক্ষের একজন সাক্ষী হয়ে। তখনই তাঁর সম্পর্কে জানতে পারি। 

বিচারকার্য শেষে আমি নিজে থেকে তাঁকে বললাম, সময় করে যদি একদিন আমার সাথে দেখা করেন, আমি ধন্য হবো। তিনি আমার কথা রাখলেন। পরদিনই সকালবেলা তিনি আমার কাছে এলেন।

কথায় কথায় তিনি বললেন, সাত বছর বয়সে তাঁর কঠিন অসুখ হয়, একটানা সাতাশ দিন গায়ে জ্বর, কিছুতেই সে জ্বর সারে না। তখন ডাক্তার তেমন ছিলো না, কবিরাজই ভরসা। কবিরাজ বললেন, 'এই ছেলে বাঁচবে না বেশিদিন'। কিন্তু সাতাশ দিনের পর হঠাতই এই জ্বর সেরে যায়। সবাই অবাক। 

এরপর চৌদ্দ বছর বয়সেও একবার এমন এক রোগ পেয়ে বসলো তাঁকে যে, সবাই ভাবলো আমজাদ আলীর আর রক্ষা নাই। এবার নিশ্চিত মৃত্যুই হবে। তখন গলা দিয়ে থেমে থেমে রক্ত যেতো। সাতদিন এই অবস্থা চললো। কবিরাজ বললো, 'এই ছেলে বড়জোর আর এক সপ্তাহ বাঁচবে'। কিন্তু সেবারও আমজাদ আলীর তেমন কিছু হলো না। হঠাৎ এই রক্তবমি বন্ধ হয়ে যায়।

বললেন, তিনি ছোটবেলা থেকে নানান রোগবালাইয়ের মধ্য দিয়ে গেছেন, প্রতি মুহূর্তে ভেবেছেন এই বুঝি মৃত্যু সামনে এলো। পরিবারের সবাইও ভাবতেন, এই ছেলে খুব কম আয়ু নিয়ে এই পৃথিবীতে জন্মেছে।

বললাম, তবু তো আপনার কিছুই হলো না। আপনি এখনো দিব্যি বেঁচে আছেন।

হাসলেন তিনি। বললেন, 'হুম। শত বছর আয়ু ছুঁতে চলেছি'।

বললাম, 'এখন কি আর মৃত্যুকে ভয় পান'?

জানালেন, মৃত্যুকে ভয় কখনোই পাননি তিনি। মৃত্যু অবধারিত, এই সত্য অস্বীকার করার উপায় তাঁরও নেই। 

বললাম, 'আরো অনেক অনেক বছর কি বাঁচতে ইচ্ছে করে আপনার? কিংবা মৃত্যুর পরে বারবার ফিরে আসতে ইচ্ছে করে এই জগতে?'

বললেন, 'আরো অনেক অনেক বছর বাঁচার ইচ্ছে নেই। তাই যদি হয় তাহলে জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে যাবে। কিন্তু সত্যি বলতে কী, বারেবারে এই পৃথিবীতে ফিরে আসতে খুব ইচ্ছে হয় আমার'। 

'এমন ইচ্ছের কারণ'? বললাম আমি। তিনি খানিক কী যেন ভাবলেন, বললেন, 'ফিরে আসতে ইচ্ছে করে, কারণ, এই মহাবিশ্বের মতো এই সংসারও বড় রহস্যময়। এই রহস্যময়তাটুকু আমার যে বড় ভালো লাগে'।

এরপর তিনি চলে গেলেন। যাবার সময় আবার কখনো একদিন দেখা করবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেলেন। আমি জানি না, সেই দেখা আর হয় কিনা! সাত বছর বয়সেই যাঁর নিশ্চিত মৃত্যুর রোগ হয়েছিলো, সেই তিনি ৯৫ বছর আয়ু অতিক্রম করে ফেলেছেন ঠিকই--কিন্তু মৃত্যু তো পায়ে পায়ে ঘুরেফিরে ছায়ারই মতোন--যদি সেই মৃত্যু ঠিকই ডাক দিয়ে দেয় তাঁকে! হঠাৎ কোনোদিন! 


জীবনের সাথে মৃত্যুই তো চিরকাল চোরপুলিশের খেলা খেলে যায়, এই কাছে তো এই দূরে। তারপর হঠাতই একদিন নিশ্চিত হাতকড়া!

Comments

Popular Posts