দাম্পত্যের গল্প
শহিদুল ইসলাম আকাশ
আমার টেবিলের ওপাশে মধ্যবয়সী একজন ভাত খাচ্ছেন। তিনি এদিকওদিক তাকাচ্ছেন না। এক মনে ভাত খাচ্ছেন আর খেতে খেতে গান গেয়ে যাচ্ছেন। গানের কথাগুলো মন্দ না, 'ছোট্ট একটা জীবন নিয়ে পৃথিবীতে কেন বলো আসা, অনন্তকাল যদি...।' কিন্তু মুখভর্তি খাবার নিয়ে গাইছেন বলে কেমন বেসুরো ঠেকছে। বিশ্রী অবস্থা।
মানুষটাকে আমি অল্পস্বল্প চিনি। দিনমজুরের কাজ করেন। খুব সম্ভবত ফজলু কি বজলু এমনই কী একটা নাম। তিনিও ভালো করেই চেনেন আমাকে। দেখা হলে খুব ইজ্জত করেন।
কিছুক্ষণ পর তিনি বয়কে কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন, তখন আমাকে খেয়াল করলেন। মুখভর্তি ভাত, গান থামিয়ে হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন। সালাম দিলেন। আমি সালামের জবাব না দিয়ে গাম্ভীর্য রেখে চায়ে চুমুক দিতে লাগলাম। বললাম, 'বসেন। খেয়ে নিন আগে।'
তিনি বসলেন। গান বন্ধ করে চুপচাপ খেতে লাগলেন। বললাম, 'গান বন্ধ করলেন কেন? গান না।' তিনি যেন লজ্জা পেলেন। হেসে খাওয়ায় মনোযোগী হলেন।
আমি প্রথাবিরোধী মানুষ। তবু কী যেন মনে করে তাঁকে বললাম, 'আমার এক দাদী বলতেন, মেয়ে মানুষ খাওয়ার সময় গান গাইলে তার স্বামী পাগল হয়।'
তিনি বললেন 'কথা সইত্য নাকি! আর পুরুষ মাইনষে যদি গান গায়, খাওনের সময়...?'
বললাম, 'তাহলে নাকি তার বউ মারা যায়।'
তিনি আড়ষ্টতা ভেঙে শব্দ করে হেসে উঠলেন, হাসতে হাসতে বললেন, 'তাইলে খাওন শেষ না হওন পর্যন্ত গান গাই। এতে যদি কাম হয় কিছু।'
বললাম, 'কেন? বউ মারা গেলে খুব খুশি হবেন নাকি?'
'হমু না? সারাদিন শুধু এটা আইনো ওইটা আইনো। আরে আমি কি টেহার মিশিন নাকি! সুইচ চাপলেই হরহরাইয়া টেহা বাইর অইবো!' আমার কথা শুনে বললেন তিনি।
বললাম, 'আপনি তো বউয়ের উপর বেজায় বিরক্ত দেখি।'
তিনি বললেন, 'বিরক্ত হমু না? কথায় কথায় বউ খালি খোঁটা দেয়।'
কেমন খোঁটা জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, 'আমার এক পুলা এক মাইয়া। অরা স্কুলে যায়। বউ কয়, পুলামাইয়াগো বাপের মতন মূর্খ বানামু না। আমি লেহাপড়া করি নাই, স্কুলের বারান্দায়ও হাঁটি নাই। তাই বইলা এমন কইরা বলতে অয়! এইটা খোঁটা না?'
বললাম, 'আপনার স্ত্রী কি পড়ালেখা করেছেন কিছু?' জবাবে তিনি বললেন, 'হ। এইট পাশ করছিলো।'
বলতে বলতে আমার চা খাওয়া শেষ হলে আমি উঠে দাঁড়ালাম। তিনি তখনো খাচ্ছেন, খেতে খেতে আবার উঁচু স্বরে গান গেয়ে চলেছেন। যেন এতেই বউ মরে যাবে আর তারপরেই তাঁর পরম শান্তি!
আমি কাউন্টারের কাছে গিয়ে বিল দিচ্ছি আর স্পষ্ট শুনছি তাঁর সেই গানের পরের কথাগুলো, 'এই মন চায় তোমাকে...।'
আমি আরেকবার তার দিকে তাকালাম। তার বোকা বোকা ধরনের চেহারাটা দেখে মোটেই মনে হলো না, তিনি তার বউ মরে গেলে খুব একটা খুশি হবেন৷ কে জানে, দাম্পত্যে হয়তো ভালোবাসাকেই ঘৃণা বলে ভ্রম হয়! হয়তোবা!


Comments
Post a Comment