সৌরভ

শহিদুল ইসলাম আকাশ

ফারহানার ফোন। বাড়ির আঙিনায় নানান জাতের গোলাপ চারা লাগিয়েছেন তিনি। সম্প্রতি তাতে ফুল ফুটেছে। ফারহানার সে কী উচ্ছ্বাস! ফোনে বললেন, আমি যেন একবার গিয়ে দেখে আসি ফুলগুলো। লাল গোলাপ, সাদা গোলাপ, আরো কী একটা রঙের গোলাপের কথা বললেন তিনি। শুনে আমি বললাম, 'গোলাপ সে রঙেরই হোক, সৌরভ তো একই। এতো উচ্ছ্বাসের কী আছে?'

গোলাপ ফুলের কথা যতোই বলুন তিনি, আমি জানি শেষে এই একটা কথাই ইনিয়েবিনিয়ে বলবেন তিনি, তাকে নিয়ে কিছু একটা লিখতে হবে। হলোও তাই। ফোন রাখার আগে বললেন, 'তা আমাকে নিয়ে কবে লিখবেন কিছু?'

এমন কথায় প্রতিবারের মতো এবারও আমি বিব্রত হলাম। আমি এমন কীইবা আর লিখি! তাছাড়া লেখা বলতে টুকটাক কিছু এক ফেসবুকেই লিখি আজকাল, আর কোথাও না। কোনো না কোনোভাবে সে লেখাগুলোই তাঁর নজর এড়ায় না হয়তো।

ত্রিশের কিছু বেশি মতো বয়স হবে ফারহানার। মাত্রই মাস ছয়েক আগে এক সামাজিক অনুষ্ঠানে তাঁর সাথে প্রথম আমার দেখা হয়। এরপর আর দেখাটেখা হয়নি। আজ অব্ধি সেই-ই শেষ দেখা। সেদিন সেই অনুষ্ঠানে অনেক লোকের ভীড়ের মধ্যে তিনি সামনে এগিয়ে এসে কুশল জানতে চাইলেন আমার। তারপর বললেন, 'আমাকে আপনি চিনবেন না। কিন্তু আমি আপনাকে চিনি। আপনি একজন জনপ্রিয় জনপ্রতিনিধি, লেখেনটেখেনও।'

তিনি আমাকে কীভাবে চেনেন, এমনকি আমার টুকটাক লেখালেখির খবরও কী করে তাঁর জানা, এবং 'জনপ্রিয়' শব্দটাতেও যে আমার আপত্তি আছে__এসব কোনো কিছুই বললাম না তাঁকে। ত্রিশোর্ধ হলেও, মেয়েটার চেহারায় কৈশোরের সারল্য উজ্জ্বল। তারচেয়েও বড় কথা তিনি অসম্ভব রূপবতীও। সুন্দরী নারীদের এক ধরণের অহমিকা থাকে, তারা মনে করে পৃথিবীর সমস্ত পুরুষ তাদের প্রেমে পড়তে মুখিয়ে আছে। কারও সাথে যেচে কথা বলে না, সুন্দরীরা একরকম অদৃশ্য বর্ম তৈরি করে নিজেদের আটকে রাখতে পছন্দ করে। এই মেয়েটি, রূপবতী হলেও, তাঁর এমন কোনো অহমিকা যে নেই, তা বুঝতে পারলাম সহজে। তাঁর সামান্য কথা ও চেহারার এক্সপ্রেশনে।

ছোট্ট একটা জীবন আমাদের। এরকম টুকরোটাকরা অনেক মুহূর্ত আমাদের জীবনে আসে, পরে সেসব আর মনে থাকে না কিংবা মনে রাখার কোনো প্রয়োজনও বোধ করি না আমরা। কিন্তু ফারহানার বেলায় এমনটা হলো না আমার। তাঁর সাথে আর দেখা না-হলেও, তিনি কীভাবে জানি আমার ফোন নাম্বার জোগাড় করে নিলেন, এরপর থেকে দুয়েকদিন পরপরই ফোন করেন তিনি। নানা প্রসঙ্গে কথা হয় তাঁর সাথে। এই আজ যেমন বললেন, তাঁর বাগানে কয়েক রঙের গোলাপ ফুল ফোটার কথা, এমন তুচ্ছ বিষয়ও। এর এক ফাঁকে তাঁকে নিয়ে কিছু একটা লেখার আবদার। তাঁর এমন পাগলামিতে আমি মনে মনে হাসি।

জানিয়ে রাখি, তিনি বিবাহিতা। তাঁর স্বামী মানুষটিও বড় সজ্জন মানুষ। ফোনে কয়েকবার তাঁর সাথে আমাকে কথাও বলিয়ে দিয়েছেন ফারহানা। কথা বলে ভালো লেগেছে খুব। হাসিখুশি ধরণের মানুষ। ফারহানার কথা আমার স্ত্রীকে বলি মাঝেমাঝে। আমার স্ত্রী তো প্রথম দিকে রেগেমেগে অস্থির হয়ে যেতো, বলতো, 'কোন এক অপরিচিত নারী ফোন করে তোমাকে! দেখো, সাবধান করে দিলাম কিন্তু।' সব ভেঙে বলার পর এখন অবশ্য আর তেমন কিছু বলে না সে। উল্টো ফারহানার আবদার তার কণ্ঠেও ফুটে উঠে, বলে, 'মেয়েটিকে নিয়ে কিছু একটা লিখতেই তো পারো। এমন ভক্ত ক'জনের ভাগ্যেই বা জোটে!'

'তা আমাকে নিয়ে কবে লিখবেন কিছু?' এই প্রশ্ন রেখে ফারহানা আমার জবাবের অপেক্ষা না-করে 'ভালো থাকবেন' বলে ফোন রেখে দিলেন।

মনে মনে ভাবলাম, সস্ত্রীক একবার তার বাসায় গিয়ে তাঁকে চমকে দিলে কেমন হয়! তাঁর বাগানের রঙ-বেরঙের গোলাপগুলো দেখে তাঁকে বলবো, গোলাপ যেমন যে রঙেরই হোক সৌরভ তার একই হয়__মানুষের বেলায়ও এই কথা খাঁটি। মানুষ সে যে ধর্ম ও বর্ণেরই হোক না কেন, সব মানুষেরই জীবনও তো একই।

আমি জানি আমার এমন সাধারণ কথাতেও ফারহানা দারুণ অভিভূত হবেন। সব মেয়েই হয়তো এমন, অতি তুচ্ছ বিষয়েও তারা অভিভূত হতে জানে।

Comments

Popular Posts