গাঢ় অন্ধকার
শহিদুল ইসলাম আকাশ
নতুন ক্লাসে শিক্ষার্থীদের প্রতি সব শিক্ষকেরই একটা প্রশ্ন থাকতো, 'পড়ালেখা শেষে তুমি কী হতে চাও?' ছাত্রজীবনে আমাদেরকেও এই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে অনেকবার।
ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি তখন, সেই সময়ের কথা। স্যার যখন 'পড়ালেখা শেষে কে কী হতে চাও'__এমন প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন, উত্তরে তখন কেউ বলছে ডাক্তার হবে, কেউবা ইঞ্জিনিয়ার হবে, কেউ লেখক; কেউ কেউ নেতা নয়তো অভিনেতা কিংবা কেউ কেউ প্রধানমন্ত্রী অথবা রাষ্ট্রপতি হওয়ার কথা জানালো।
এক সহপাঠিনীর কথা মনে পড়ে। কলেজের প্রথম দিন প্রথম ক্লাসেই সে জানিয়ে দিয়েছিলো, পড়ালেখা শেষে সে বৈমানিক হবে। সমস্ত আকাশটা নিজের করে নিয়ে সে ওড়ে বেড়াবে পাখির মতো, পায়ের নিচে রেখে এই মাটির পৃথিবী। কলেজে একমাত্র বৈমানিক হওয়ার স্বপ্ন দেখা শিক্ষার্থী। সেই থেকে আমাদের সবার কাছে তার নাম হয়ে গেলো, 'পাইলট'।
সারা ক্লাস মাতিয়ে রাখার অনন্য এক ক্ষমতাও ছিলো তার। এমন প্রাণোচ্ছল, চঞ্চল মেয়ে ছিলো সে! পরবর্তীতে তার সাথে আমার বেশ গাঢ় বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। পাঠ্যবইয়ের বাইরেও তার ছিলো বিশাল বইয়ের জগত। বিজ্ঞান, সাহিত্য, চিত্রকলা__সব বিষয়েই তার ছিলো অগাধ জ্ঞান। কখনোকখনো তার কাছে জানতে চাইতাম, এই বয়সে সে এতো এতো বই কীভাবে সংগ্রহ করে। জবাবে, জন স্টেইনবেকের উপন্যাস থেকে উঠে আসা রহস্যময় চরিত্রের মতো তার ছিলো রহস্যময় উত্তর, 'ইচ্ছে থাকলে সব হয়।' বলতো, 'তোরা যে আমাকে পাইলট পাইলট বলে ক্ষেপাস, আমি একদিন ঠিকই পাইলট হয়ে তোদের দেখিয়ে দেবো, দেখিস।'
ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে পাশ করে সে। কিন্তু তার বাবার চাকরীর বদলীর কারণে এরপর তাকে অন্যত্র চলে যেতে হয়। খুব সম্ভবত রাজশাহীতে। যাওয়ার আগের দিন সে সব বন্ধুদের সাথে দেখা করে গেলো। বললো, একদিন সে যখন পাইলট হবে, তখন সবাইকে সে খুঁজে খুঁজে বের করবে। স্বভাবসুলভ হাসিতে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সে যখন সামনে পা বাড়ালো, মনে পড়ে, একবারও পিছন ফিরে তাকায়নি। পিছন ফিরে তাকালেই হয়তো তার চোখের জল আড়াল করার আর কোনো উপায়ন্তর থাকতো না!
এরপর তার সাথে আমার বা আমার অন্য বন্ধুদের কারোরই কোনো ধরণের যোগাযোগ হয়নি। কিন্তু এখনো মাঝেমাঝে কোনো কোনো অবকাশের মুহূর্তে তার কথা খুব করে মনে পড়ে। সে এখন কোথায় আছে? পাইলট কি সে হতে পেরেছে? পাখির মতো ওড়েওড়ে সে কি ঘুরে বেড়ায় ইস্তাম্বুল থেকে ইসলামাবাদ, হিথ্রো থেকে সিডনি?
কোনো কোনো রাতে মাথার উপর যখন বিমান ওড়তে দেখি, তখন মনে মনে ভাবি, আমার সে বন্ধুও কি এমনই কোনো রাতে চালকের আসনে বসে বিমান চালাতে চালাতে একবার নিচের দিকে তাকায়! গাঢ় অন্ধকারে মহাকাশ থেকে মাটির দিকে চেয়ে, নানানরঙের আলো ঝলমল করে জ্বলে থাকতে দেখে, তখন সে কি এই সত্য বুঝতে পারে যে, এই ঝলমলে আলোয়রাঙা গ্রহের গভীরেই লুকিয়ে আছে কী নিঃসীম গাঢ় অন্ধকার!
নতুন ক্লাসে শিক্ষার্থীদের প্রতি সব শিক্ষকেরই একটা প্রশ্ন থাকতো, 'পড়ালেখা শেষে তুমি কী হতে চাও?' ছাত্রজীবনে আমাদেরকেও এই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে অনেকবার।
ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি তখন, সেই সময়ের কথা। স্যার যখন 'পড়ালেখা শেষে কে কী হতে চাও'__এমন প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন, উত্তরে তখন কেউ বলছে ডাক্তার হবে, কেউবা ইঞ্জিনিয়ার হবে, কেউ লেখক; কেউ কেউ নেতা নয়তো অভিনেতা কিংবা কেউ কেউ প্রধানমন্ত্রী অথবা রাষ্ট্রপতি হওয়ার কথা জানালো।
এক সহপাঠিনীর কথা মনে পড়ে। কলেজের প্রথম দিন প্রথম ক্লাসেই সে জানিয়ে দিয়েছিলো, পড়ালেখা শেষে সে বৈমানিক হবে। সমস্ত আকাশটা নিজের করে নিয়ে সে ওড়ে বেড়াবে পাখির মতো, পায়ের নিচে রেখে এই মাটির পৃথিবী। কলেজে একমাত্র বৈমানিক হওয়ার স্বপ্ন দেখা শিক্ষার্থী। সেই থেকে আমাদের সবার কাছে তার নাম হয়ে গেলো, 'পাইলট'।
সারা ক্লাস মাতিয়ে রাখার অনন্য এক ক্ষমতাও ছিলো তার। এমন প্রাণোচ্ছল, চঞ্চল মেয়ে ছিলো সে! পরবর্তীতে তার সাথে আমার বেশ গাঢ় বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। পাঠ্যবইয়ের বাইরেও তার ছিলো বিশাল বইয়ের জগত। বিজ্ঞান, সাহিত্য, চিত্রকলা__সব বিষয়েই তার ছিলো অগাধ জ্ঞান। কখনোকখনো তার কাছে জানতে চাইতাম, এই বয়সে সে এতো এতো বই কীভাবে সংগ্রহ করে। জবাবে, জন স্টেইনবেকের উপন্যাস থেকে উঠে আসা রহস্যময় চরিত্রের মতো তার ছিলো রহস্যময় উত্তর, 'ইচ্ছে থাকলে সব হয়।' বলতো, 'তোরা যে আমাকে পাইলট পাইলট বলে ক্ষেপাস, আমি একদিন ঠিকই পাইলট হয়ে তোদের দেখিয়ে দেবো, দেখিস।'
ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে পাশ করে সে। কিন্তু তার বাবার চাকরীর বদলীর কারণে এরপর তাকে অন্যত্র চলে যেতে হয়। খুব সম্ভবত রাজশাহীতে। যাওয়ার আগের দিন সে সব বন্ধুদের সাথে দেখা করে গেলো। বললো, একদিন সে যখন পাইলট হবে, তখন সবাইকে সে খুঁজে খুঁজে বের করবে। স্বভাবসুলভ হাসিতে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সে যখন সামনে পা বাড়ালো, মনে পড়ে, একবারও পিছন ফিরে তাকায়নি। পিছন ফিরে তাকালেই হয়তো তার চোখের জল আড়াল করার আর কোনো উপায়ন্তর থাকতো না!
এরপর তার সাথে আমার বা আমার অন্য বন্ধুদের কারোরই কোনো ধরণের যোগাযোগ হয়নি। কিন্তু এখনো মাঝেমাঝে কোনো কোনো অবকাশের মুহূর্তে তার কথা খুব করে মনে পড়ে। সে এখন কোথায় আছে? পাইলট কি সে হতে পেরেছে? পাখির মতো ওড়েওড়ে সে কি ঘুরে বেড়ায় ইস্তাম্বুল থেকে ইসলামাবাদ, হিথ্রো থেকে সিডনি?
কোনো কোনো রাতে মাথার উপর যখন বিমান ওড়তে দেখি, তখন মনে মনে ভাবি, আমার সে বন্ধুও কি এমনই কোনো রাতে চালকের আসনে বসে বিমান চালাতে চালাতে একবার নিচের দিকে তাকায়! গাঢ় অন্ধকারে মহাকাশ থেকে মাটির দিকে চেয়ে, নানানরঙের আলো ঝলমল করে জ্বলে থাকতে দেখে, তখন সে কি এই সত্য বুঝতে পারে যে, এই ঝলমলে আলোয়রাঙা গ্রহের গভীরেই লুকিয়ে আছে কী নিঃসীম গাঢ় অন্ধকার!

Comments
Post a Comment