শব্দ নিঃশব্দ
শহিদুল ইসলাম আকাশ
আবুল খায়ের প্রবাসী ছিলেন। জীবনের সুদীর্ঘ কাল তিনি প্রবাসে কাটিয়েছেন। দু'বছরে একবার দু' থেকে তিন মাসের ছুটিতে দেশে আসতেন। একটা সময় তাঁর একমাত্র ছেলেকে পড়ালেখা শেষে দুবাইর এক মানি একচেঞ্জ কোম্পানীতে চাকরি যোগাড় করে দিয়ে তিনি প্রবাস জীবনের ইতি টেনে দেশে ফিরলেন। ততোদিনে তিনি ষাটের বেশি বয়স পার করেছেন। ভিসা ছিলো, তবু তিনি আর বিদেশ করবেন না বলেই মনস্থির করলেন। দেশে এসে বললেন, 'আর বিদেশ করবো না।'
দেশে আসার পর তাঁর চলাফেরা কথাবার্তা কেমন অপ্রকৃতিস্থ হয়ে গেলো। দেশে ফেরার পরদিন থেকেই তিনি একটা কবরস্থান করার কাজে লেগে গেলেন। তাঁদের পারিবারিক কবরস্থান যেটা ছিলো, সেটাতে আর কবর দেবার জায়গা নেই, বললেন, মৃত্যুর পরের জায়গাটাই তো আসল জায়গা, সেটা আগে ঠিক করে নেওয়া চাই।
বাড়ির অদূরে আবুল খায়েরের পৈতৃক সাড়ে তিন শতকের একটা জমি ছিলো, সেটাতেই কবরস্থান করার কথা ভাবলেন। পতিত জমি, কবরস্থান বানাতে হলে এটাকে সংস্কার করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, জমিটা ভরাট করতে হবে। ভরাট করতে খরচও কম হবে না। খরচের কথা ভাবলেন না তিনি। এক মাসের মধ্যে জমিটা ভরাট করে ফেললেন।
জমি ভরাট করে কবরস্থান বানানো অপ্রকৃতিস্থের মধ্যে পড়ে না, অপ্রকৃতিস্থ বলার কারণ, প্রতিদিন এক-দুইবার সেখানে গিয়ে অনেকটা সময় বসে থাকেন তিনি। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে বলেন, 'নতুন মাটি বসতে অনেক সময় লাগে। দুয়েক বর্ষার বৃষ্টিতে ভিজলে বসে যাবে৷ মাটি তখন কবরের জন্য উপযুক্ত হবে। এখন আমি সেই অপেক্ষায় আছি।'
টানা তিন বর্ষা গেলো। জমির মাটিও শক্ত হলো। সাড়ে তিন শতকের জমিটার পশ্চিমের উত্তর কোণায় তিনি চিহ্ন দিয়ে রাখলেন। স্ত্রী, পুত্র ও আত্মীয়স্বজনকে বলে রাখলেন, সেই স্থানে যেন তাঁকে কবর দেওয়া হয়। তিনি আরো বললেন, দুই মাস পরে আষাঢ় মাসের এক ঝুমবৃষ্টির রাতে তাঁর মৃত্যু হবে।
আবুল খায়েরের এই পাগলামি দেখে সবাই যারপরনাই বিরক্ত। কেউ কেউ আড়ালে হাসাহাসি করতেও ছাড়ে না। বয়স ষাট পেরিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু এখনো তো আবুল খায়েরের শরীরের গাঁথুনি বেশ মজবুত, এমন মৃত্যু মৃত্যু করার কোনো মানে হয়!
কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে, এর ঠিক দুই মাস পরেই এক রাতে আবুল খায়েরের মৃত্যু হয়। যদিও সেদিন ঝুমবৃষ্টি তো দূরের কথা, আকাশে এক টুকরো মেঘও না-থাকলেও, আষাঢ় মাসই ছিলো তখন।আকাশে ভেসে ছিলো আষাঢ়ী পূর্ণিমার ঝকঝকে রূপালী চাঁদ। কী যে অপূর্ব সেই চাঁদের আলো!
আবুল খায়েরের মৃত্যুর পর তাঁর কবরস্থানে তাঁরই নির্ধারণ করে দেওয়া স্থানে তাঁকে সমাহিত করা হলো। দাফনকাজ শেষ না-হওয়া পর্যন্ত আমিও সেখানে উপস্থিত থাকি। মৌলভী সাহেব দাফনের সব আনুষ্ঠানিকতা সেরে মোনাজাত ধরলেন। মোনাজাতে আবুল খায়ের এবং সমগ্র মানবজাতির জন্য দোয়াপ্রার্থনা করা হলো।
তারপর 'আমিন' বলে মোনাজাত শেষ করে কবরস্থান থেকে বের হতে গিয়ে, কেন জানি না, এক ধরনের বিভ্রম আমাকে পেয়ে বসলো। বলা হয়, মৃত্যু নিঃশব্দে আসে, আদতেই কি তা!
তাই যদি হয় তো, কী করে আবুল খায়ের তাঁর মৃত্যুর 'শব্দ' আগাম টের পেলেন!
পুনশ্চঃ
'শব্দ' শব্দটাতে উদ্ধৃতিচিহ্ন ব্যবহার করতে হলো। কোনো মৃত্যুই কি সত্যি নিঃশব্দে আসে? না মনে হয়।


Comments
Post a Comment