বৃত্ত

শহিদুল ইসলাম আকাশ


'দোস্ত এক কাপ চা দে দেখি।' বন্ধু আলী তার চায়ের দোকানে চা বানাতে ব্যস্ত হয়ে গেলো। দোকানের সামনে চিপস, চানাচুর, কাস্টার কেক, ছোটছোট বিস্কুটের প্যাকেট ঝুলানো। সামনে একটাই মাত্র টুল, সেখানে আরো দুয়েকজন কাস্টমার বসে আছে। ভেতরে চুলার উপর কেতলিতে চাপাতা রঙ করা হচ্ছে, সসপানে গরুর দুধ। বললাম, 'আগে অন্য কাস্টমারদের চা দে, আমাকে তাদের পরে দিলেও চলবে।'

আলী চা বানাচ্ছে আর আমি তার দিকে তাকিয়ে তাকে দেখছি। স্কুলে অসাধারণ ছাত্র ছিলো সে। প্রতিটি পরীক্ষায় তার সমান নাম্বার আমাদের কারো হতো না। সেই আলী আর এই আলীতে আকাশপাতাল তফাত।

শৈশবের দিনগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠলো অকস্মাৎ। তখন আলীর স্বপ্ন ছিলো সে ইবনে বতুতার মতো ভূপর্যটক হবে--আজ ইস্তাম্বুল তো কাল প্যারিস, পরশু কাবুল--ঘুরেঘুরে পৃথিবীর পথে হেঁটে বেড়াবে সারাজীবন। সেই আলীই কিনা ঝুপড়ি একটা চায়ের দোকানে নিজেকে বন্দী করে ফেললো! যে চায়ের দোকানের বৃত্তেই গত ষোলোটা বছর আটকে আছে সে! বাকি জীবনেও হয়তো এই বৃত্ত ভাঙবে না তার।

অন্য কাস্টমারদের আগে আলী আমার দিকে চা বাড়িয়ে দিলো। আমি চা হাতে নিতে নিতে বললাম, 'তা আর কী খবর তোর?' আলী হাসলো, বললো, 'এই যেমন দেখছিস।' আমি তার স্মৃতি উসকে দিলাম, বললাম, 'তোর মনে আছে, একটা সময় তোর খুব ইচ্ছে ছিলো মনের সুখে দেশবিদেশ ঘুরে বেড়াবি? তোর সেই ইচ্ছে কি আজও আছে?'

আলী জবাব দিলো না। ঈষৎ হাসলো শুধু।

আমি চা খাচ্ছি আর মনে মনে ভাবছি, মানুষের জীবনটা এমন কেন! যা সে মনে মনে আরাধনা করে, তা তার নাগালের বাইরেই থেকে যায়। কেন!

Comments

Popular Posts