ছায়ার খোঁজ

শহিদুল ইসলাম আকাশ

শিকদার স্যার এসেছেন তাঁর মেয়ের বিয়ের দাওয়াত দিতে। সামনের সপ্তাহের বুধবারে বিয়ে। বিয়ের কার্ড বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, 'তুমি আসলে আমি খুশি হবো।' সেই কবে শেষ দেখেছিলাম স্যারকে, তা প্রায় বছর বিশের কম হবে না। তবে মাঝেমাঝে এরওর মাধ্যমে স্যারের খবরাখবর পেতাম।

দাওয়াত পেয়ে স্যারকে কথা দিলাম, যাবো।

শিকদার স্যার প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। আমি যখন ফোর-ফাইভে পড়ি, সেই সময় সন্ধ্যার পরে বাসায় এসে আমাকে প্রাইভেট পড়াতেন তিনি। অংকে ভালো শিক্ষক ছিলেন। আদর যেমন করতেন আমাকে, শাসনেরও কম কিছু ছিলো না।

শিকদার স্যারের দিকে তাকিয়ে আপাদমস্তক দেখে নিলাম একবার। আগে যেমন খুব সাদামাটা ধরণের পোশাক পরতেন, এখনও তেমনই আছেন তিনি। বয়সটা বেড়েছে এবং বয়সের সেই ছাপ চেহারায় স্পষ্ট হয়েছে শুধু।

আমি বিয়ের কার্ডটা খুলে পড়লাম। স্যারের কাছে ছেলে কী করে জানতে চাইলাম। বললেন, 'ছেলে প্রবাসী। আমিরাতে খুব সামান্য বেতনের একটা চাকরি করে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, ছেলেটা শিক্ষিত।'

ঠাট্টা করে বললাম, 'আপনার একটামাত্র মেয়ে, তাই জামাই আপনার মতো শিক্ষক হবে ভেবেছিলাম।' শিকদার স্যারও হাসলেন। বললেন, 'আমারও এমন ইচ্ছে ছিলো। তাহলে স্বামীর মধ্যে মেয়ে তার বাবার ছায়া দেখতে পেতো। আমাদের সময়ে বিয়ের বাজারে পাত্র হিসেবে স্কুলশিক্ষক মানেই ছিলো নগণ্য পাত্র। তাদের খেয়ে না খেয়ে থাকতে হতো, আদর্শটাকে সঙ্গী করে। এখন সময় পাল্টেছে, এখন তো শিক্ষকদের বেতন অনেক। শিক্ষক পাত্রও এখন তাই সোনার হরিণের মতো কিছু।'

এরমধ্যে আমার স্ত্রী চা-নাস্তা নিয়ে এলো। আমার বাচ্চা ছেলেমেয়ে দু'টোও সামনে এলো। তিনি আমার স্ত্রীর কাছে কুশল জানতে চাইলেন, ছেলে ও মেয়েকে দুই পাশে আগলে নিয়ে বললেন, 'তোমরা কি জানো, তোমাদের বাবা লেখাপড়ায় কী ভীষণ ভালো ছাত্র ছিলো!'

শিকদার স্যার বিদায় নিয়ে চলে যাবার সময়, আমি দরজায় দাঁড়িয়ে স্যারের চলে যাবার দিকে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার মনে হলো, আমি যেন আমার শৈশবকেই ছুঁয়ে দিলাম আবার। যে শৈশবটা আর কখনোই ফিরে আসবার নয়, কিছুতেই।

শিকদার স্যারের মেয়েকে আমি দেখিনি কখনো। শুনেছি শুধু যে, স্যারের শুধু একটাই মেয়ে। সন্তানও এই একটাই। স্যারের মেয়ের জামাই ছেলেটা কেমন হবে কে জানে! বাবার মতো শিক্ষক না-হলেও, এই ছেলের মধ্যেও স্যারের মেয়েটা তার বাবার ছায়া খুঁজে নিতে পারবে তো! মনে মনে আমি খুব করে চাই, যেন অবশ্যই পারে এবং তারা যেন সুখি হয়।   

Comments

Popular Posts