রজব আলী

শহিদুল ইসলাম আকাশ

রজব আলী 'উকিল' ছিলেন। এই উকিল আবার কোর্টের উকিল নয়, ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে নিজের মক্কেলকে নির্দোষ প্রমাণের ঝামেলার মতো ব্যাপার নয়, বিয়েশাদির উকালতি করতেন তিনি। আমার ছোটবেলায় দেখেছি, রজব আলীকে দেখলে এলাকার কিশোরী মেয়েগুলো লুকিয়ে যেতো, কখন তারা রজব আলীর চোখে পড়ে যায় আর বাবার বাড়ি থেকে 'বিদেয়' হতে হয়, এই ভয়ে।

সেকালে যাদের ঘরে বিবাহযোগ্য মেয়ে আছে, রজব আলী তাদের ঘরে যেমন বিশেষ সমাদর পেতেন--প্রবাসফেরত অবিবাহিত বয়স্ক ছেলেদের এবং বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাওয়া কিংবা কম সুন্দর মেয়েদের ঘরে সমাদর পেতেন তারচেয়ে বেশি। ডিভোর্সি মেয়ে কিংবা ছেলের পুনর্বার বিয়ের বেলাতেও রজব আলীই ছিলেন একমাত্র ভরসা।

ধবধবে সাদা লুঙ্গি ও পাঞ্জাবি পরে, বগলে ছাতা হাতে রজব আলী বাড়িবাড়ি ঘুরে বেড়াতেন। তাঁর পান-খাওয়া মুখে হাসি লেগে থাকতো। কার ঘরে কেমন বিবাহযোগ্য মেয়ে আছে, কোন পরিবারের ছেলে পাত্র হিসেবে কেমন এবং তাদের বৈষয়িক অবস্থা থেকে সামাজিক অবস্থান--সব কিছু রজব আলীর নখদর্পণে থাকতো।

একেকটা বিয়ে জুড়ে দিলে রজব আলীকে নতুন একটা লুঙ্গি বা পাঞ্জাবি সাথে কিছু টাকা দেওয়া হতো। এতেই স্ত্রী, এক ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে কোনোমতে সংসারের খরচ নির্বাহ করতেন তিনি। রজব আলীর অন্য কোনো পেশা ছিলো না, এই 'উকালতি' বা 'ঘটকালি' করে সংসার চালানো ছাড়া।

রজব আলী মারা গেছেন প্রায় পনেরো বছর আগে। একটু আগে ঢাকা থেকে একটা ছেলে ফোন করে যখন নিজের পরিচিতি দিতে গিয়ে রজব আলীর ছেলে বলে পরিচয় দিলো, অনেক বছর পর রজব আলীর কথা হঠাৎ মনে পড়ে গেলো আমার। নয়তো রজব আলীর কথা আমার একদম মনেই ছিলো না। 

রজব আলীর ছেলেটার নাম জাফর। জাফরের একটা জাতীয়তা সনদপত্র লাগবে, এই জন্যই আমার নাম্বার জোগাড় করে আমাকে ফোন করেছে সে। আমি তাকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রাদি সাথে করে একবার এখানে এসে নিয়ে যেতে বললাম। তারপর ফোন রেখে দিলাম।

ফোন রেখেই রজব আলীর কথা ভাবতে লাগলাম। রজব আলীর চেহারাটা মনে করতে চেষ্টা করলাম--পরনে সেই সাদা লুঙ্গি ও পাঞ্জাবি, বগলে ছাতা; মুখভর্তি পানে টকটক লাল ঠোঁট, হাসিহাসি মুখ! আহা, জগতের কোনো দুঃখই যেন কখনো ছুঁয়নি মানুষটাকে!   

Comments

Popular Posts