ভালোবাসার সময়
শহিদুল ইসলাম আকাশ
গতকাল রাতে মেসেঞ্জারে সে আমাকে জানায়, তার শহর সুদূর বগুড়া থেকে সে চট্টগ্রামে এসেছে এবং আমার সাথে দেখা করতে চায়। আমি ভীষণ ব্যস্ত একটা জগতে বাস করি, প্রতিদিনের সব কাজ আগের দিন ঠিকঠাক করা থাকে। তবু যে ছেলেটি ৫০০ কিলোমিটার দূর থেকে ছুটে আসতে পারে, তার সাথে দেখা করা অবশ্যই প্রয়োজন মনে করলাম। অন্য সব কাজ চুলোয় যাবে তো যাক।
দেখা হলো। ঘন্টা তিনেকের মতো কথাও হলো। নানা প্রসঙ্গ আসে আর যায়। ধানমণ্ডির বত্রিশে বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে কেন জুতা পায়ে মানুষ ঢুকে, যেখানে জাতির পিতার রক্ত লেগে আছে, কেন আমি সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আজকাল লিখি না, আমার কোন কোন লেখাটা তার হৃদয়ে দাগ কেটেছে--এসবকিছু নিয়ে যখন সে কথা বলছিলো, তখন আমি একটু পরপর তার চোখের দিকে তাকাচ্ছিলাম। দেখছিলাম, তার সেই চোখের তারায় এক প্রান্তবিহীন পৃথিবী, যে পৃথিবীর সবটুকু জুড়ে জ্যোতি নামের অসম্ভব রূপবতী একটি মেয়ে। যে মেয়েটি আর কোনোদিনও তার একান্ত হবে না।
মাত্র আটাশ বছর বয়স ছেলেটির। এই বয়সে নানান জটিল রোগ বাসা বেঁধেছে তার শরীরে। চিকিৎসার জন্য প্রায়ই এখানেওখানে ছুটতে হয় তাকে, ভারতেও যেতে হয় প্রতি কয়েক মাসের ব্যবধানে। তার হৃদপিণ্ডে রক্ত পাম্প করার জটিলতা আছে। ডাক্তার নাকি তাকে বলেছে, যে কোনো সময় কিছু একটা ঘটে যেতে পারে। তাই সে জীবনটাকে পাশ বালিশের মতো এপাশওপাশ করে দেখে নিতে চায়, যতোটুকু সম্ভব। কেননা সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে, দ্রুত। রবার্ট ফ্রস্টের কবিতার মতো, ঘুমিয়ে পড়ার আগে সে আরো কিছুদূর যেতে চায়।
থেকে যেতে বললাম অনেক, কিন্তু তার কী একটা জরুরি কাজ আছে, না-গেলেই নয়। যেতে দিতে হলো। তিন ঘন্টা পর যখন তাকে গাড়িতে তুলে দিলাম, তখন মনে হলো, এই অসাধারণ ছেলেটার সাথে আজই প্রথম আলাপ হলো, তা যেন সত্যি নয়। যেন কতোকাল আগে থেকে তার সাথে আমার পরিচয়।
চলে গেলো ছেলেটা। খুব ইচ্ছে ছিলো তাকে বলি, শুধু তোমার জীবনই দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে না, দ্রুতই সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে আমাদের সবারই। একই সাথে আমাদের সবারই ভালোবাসার সময়গুলোও বড্ড কম। নতুন করে আবার কাউকে ভালোবাসতে চেষ্টা করো, ভাই।
বলা হয়নি।
তাকে বিদায় দিয়ে আমার প্রাত্যহিক কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলাম আবার। ফেলে রাখা কাজগুলো গুছিয়ে নিতে নিতে মধ্যরাত হয়ে গেলো। তবু সারাদিনের দীর্ঘ ক্লান্তি ভুলে তার কথা ভাবতে লাগলাম আমি। আমার কানের কাছে থেমে থেমে শুনতে পেতে লাগলাম তার বিষাদী কণ্ঠ, 'সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে...।'
আমি চাই ছেলেটা মৃত্যুকে জয় করে নিক। বিয়েটিয়ে করে সংসারী হোক। জ্যোতিকে পাওয়া হবে না কিন্তু তার সেই বউয়েরও যেন হয় জ্যোতির মতো ভৈরবী রূপ। জ্যোতির মতো সেই মেয়েটির জন্যও যেন সে গভীর ভালোবাসা অনুভব করতে পারে। কোনো কোনো তুমুল বৃষ্টির রাতে সেই মেয়েটিকে সে যখন বুকে জড়িয়ে ধরে রাখবে, তখন ভালো লাগায় মেয়েটি যেন লজ্জাবতী লতার মতো কেঁপে কেপে গুটিয়ে যায় তার বুকের ভাঁজে।
তখন ছেলেটি যেন বুঝতে পারে যে, সময় ফুরিয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু বড্ড কম হলেও, এক ভালোবাসারই সময় ফুরিয়ে যায় না কখনোই। তখন একটি মুহূর্তই হতে পারে আস্ত একটি মহাকাল। সেই সে মহাকাল ছেলেটির হোক।


Comments
Post a Comment