আহা, মায়া!

শহিদুল ইসলাম আকাশ

শহরের এক মার্কেটে কাপড়ের দোকান ছিলো আমার। দুইজন কর্মচারী, তারাই দেখাশুনা করতো দোকানটা। আমার আরো একটা ষ্টেশনারী দোকান ছিলো, দিনের সময়টা সেটাতে বসতে হতো, কাপড়ের দোকানটাতে সন্ধ্যার পরে গিয়ে বসতাম ঘন্টাদুয়েক। সারাদিনের হিসেবনিকেশ শেষ করে দোকান বন্ধ করে বাসায় ফিরতাম।

একদিনের ঘটনা। এক কাস্টমার শার্ট কিনতে এসেছেন। পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়স। দেখতে ভদ্রলোক গোছের। দোকানের কর্মচারী বিদেশি দামি ব্রাণ্ডের কিছু শার্ট দেখালো, ভদ্রলোক বললেন, 'এতো দামি না। কম দামের শার্ট দেখান।' কর্মচারী ছেলেটা লোকাল শার্টগুলো বের করলো। এর থেকে ভদ্রলোক একটা শার্ট পছন্দ করলেন তারপর দাম জানতে চাইলেন। কর্মচারী ছেলেটা দাম বললো, '৫০০ টাকা'। কাস্টমারটাকে যতো ভদ্রলোক মনে হয়েছিলো, তাঁর দরদাম করার বাড়াবাড়ির ধরণ দেখে আর ভদ্রলোক মনে হলো না।

তিনি ২৫০ টাকা মুলালেন। তারপর ১০ টাকা করে বাড়তে বাড়তে ৩০০ টাকা পর্যন্ত উঠলেন। শার্টটার কেনামূল্য ৩৫০ টাকা, ৩০০ টাকায় দেবার প্রশ্নই আসে না। কর্মচারী ছেলেটা সবশেষে একদাম ৪০০ টাকা বললো। শার্ট না কিনে তিনি চলে গেলেন। মিনিট বিশেক পর তিনি আবার এলেন, এবার ২০ টাকা বাড়ালেন। তাতেও না-হওয়াতে আর ৩০ টাকা বাড়িয়ে ৩৫০ টাকা বললেন। কর্মচারী ছেলেটা আমার দিকে তাকালো, মানুষটার এমন দরাদরি দেখে সে কিছুটা বিব্রত। বললাম, 'দিয়ে দাও। সবসময় লাভের হিসেব চলে না।' 

শার্ট প্যাকেট করে দেওয়া হলো। তিনি শার্ট নিয়ে চলে গেলেন। মনে মনে বললাম, এমন কঞ্জুস কাস্টমার নিয়মিত আসলে ব্যাবসার পাঠ দ্রুতই চুকে দিতে হবে।

এর ঠিক পরের দিন মানুষটার সাথে আমার আবার দেখা। দেখেই চিনলাম। আমার এক আত্মীয় স্ট্রোক করেছেন, তাঁকে দেখতে মেডিকেলে গেছি। ঢুকার মুখে দেখি রক্তমাখা এক যুবককে কোলে করে মেডিকেলের দিকে এগিয়ে আসছেন তিনি। যুবকটার রক্তে তাঁর সারা গায়েও রক্ত মাখামাখি হয়ে আছে।

আমি চিনলেও, আমাকে তিনি চিনলেন না। পাশ কাটিয়ে আমি আমার অসুস্থ আত্মীয়কে দেখতে মেডিকেলের ভেতর ঢুকে গেলাম। মিনিট বিশেক পর বের হতে গিয়ে, তিনতলা থেকে নিচের দিকে নামছি, দু'তলায় আবার তাঁর সাথে দেখা। অপারেশন থিয়েটারের বাইরে একবার এদিক একবার ওদিক হাঁটছেন। চোখেমুখে উৎকণ্ঠার ছাপ।

আমি তাঁর সামনে এগিয়ে গেলাম। আগেরদিন আমার দোকানে তিনি এসেছিলেন, তা মনে করে দিলাম। বললাম, 'রোগী আপনার কে হয়?' তিনি বললেন, 'তেমন কেউ না।' বললাম, 'আত্মীয় অথবা চেনাজানা কেউ না?' তিনি বললেন, 'না। আজই প্রথম দেখা তার সাথে।'

বিস্ময় নিয়ে বললাম, 'তাহলে...'।

তিনি বললেন, 'সে সিএনজি অটোরিকশা চালক। আমি ওর সিএনজিতে করে বাসায় ফিরছিলাম, পথে একটা পিকআপ মুখোমুখি ধাক্কা দেয়। আমার কিছু হয়নি কিন্তু ড্রাইভার ছেলেটা গুরতর আহত হয় এতে। দ্রুত ছেলেটাকে মেডিকেলে নিয়ে আসতে হলো।'

এরমধ্যে একজন নারী অপারেশন থিয়েটার থেকে বের হয়ে বললেন, 'রোগীর অনেকগুলো টেস্ট করাতে হবে। ছয় হাজার টাকা লাগবে।' তিনি একবারও না ভেবে মানিব্যাগ থেকে ছয় হাজার টাকা বের করে দিলেন। এরপর কাকে যেন ফোন করলেন, কথার ধরণ দেখে মনে হলো ফোনের ওপাশে তাঁর সন্তান হয়তো। ফোনে বললেন, 'এখনই আমার জন্য বিশ হাজার টাকা নিয়ে মেডিকেলে আয়। তোর মায়ের আলমারির ড্রয়ারে টাকা আছে। দ্রুত নিয়ে আয়।'

আমি অবাক হয়ে মানুষটাকে দেখছিলাম। একদিন আগে একটা শার্ট কিনতে গিয়ে মাত্র ১০-২০ টাকা কমানোর জন্য সে কী দরাদরি করেছিলেন তিনি! এমন কঞ্জুসিপনায় বিরক্তও হয়েছিলাম। সেই একই মানুষের এমন উদারতা দেখে অবাক না-হয়ে কি পারা যায়!

চলে আসার সময় দেখি তিনি হু হু করে কাঁদছেন। একজন অচেনা অপরিচিত যুবকের জন্য তাঁর এই কান্না কী অর্থ বহন করে! আমি আরেকবার পিছনে গিয়ে তাঁর পিঠে হাত রাখলাম। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বললেন, 'আহত এই ছেলেটার বয়সী আমার ছেলেটাও। খুব খারাপ লাগছে বিশ্বাস করুন। তাছাড়া এই দুর্ঘটানায় আমারও তো কিছু একটা হয়ে যেতে পারতো।'

এরপর অপারেশন থিয়েটার থেকে একজন ডাক্তার বের হয়ে এলেন। ডাক্তার বললেন, 'পেশেন্ট খুব সিরিয়াস।' ডাক্তারের কথা শুনে হাতজোড় করে তিনি বলতে লাগলেন, 'যে কোনো মূল্যে ছেলেটাকে সুস্থ করে তুলুন। টাকা যা লাগে আমি ব্যবস্থা করবো।' বলছেন আর একটু পরপর চোখ মুছছেন তিনি।

তাই দেখে মনে মনে বললাম, মানবজীবন বড় অদ্ভুত জীবন। এখানে মায়া নামের অদ্ভুত এক বোধ থাকে। যে মায়াই চিরকাল মানুষকে ডুবিয়েছে যেমন, একই সাথে আবার দিয়েছে মহান এক উচ্চতা। আহা, মায়া!

Comments

Popular Posts