সুখি মানুষ

শহিদুল ইসলাম আকাশ


একটু পরপর আকাশের দিকে তাকাচ্ছি, বৃষ্টি পড়ছে তো পড়ছেই। রাস্তার ধারে একটা বাড়ির গেটের সামনে সামান্য ছাউনিমত আছে, সেই কখন থেকে সেখানে দাঁড়িয়ে আছি। কখন বৃষ্টি থামে এই আশায়। কিন্তু এক ঘন্টা হয়ে যাবার পরও বৃষ্টি থামে না। আমার বিরক্তির সীমা রইলো না--জরুরি একটা মিটিং আছে, দ্রুত না-গেলেই যে নয়।

আমি একা নই, আমার আগে থেকেই একটা পাগলও এখানে আছে। সে দাঁড়িয়ে নেই, বসে আছে। দুই পা মুড়ে অদ্ভুত কায়দা করে বসেছে। বয়স আন্দাজ করতে পারছি না, পঞ্চাশের বেশি বা কাছাকাছি হতে পারে। মুখভর্তি এলোমেলো দাঁড়ির অনেকটাই পাকা, চুলেরও দশা একই। পরনে জীর্ণ পোশাক। একটু পরপর বিক্ষিপ্ত নানান কথা বলে যাচ্ছে সে, সব কথাই আমাকে উদ্দেশ্য করে।

আমাকে ঘনঘন আকাশের দিকে তাকাতে দেখে এবং কাজের তাড়ায় আমার চোখমুখের বিরক্তিভাব দেখে পাগল মানুষটা আমার দিকে তাকিয়ে বললো, 'এতো অস্থির হয়ে আছো ক্যান? মাইনষে পেরেমে পড়লে অস্থির হয়, তুমি তো আর কারো পেরেমে পড়ো নাই। বলো পড়ছো? দেখে তো শাদিসুদা মনে হয়। নিজের পুলাপাইনও থাকবার পারে। কও আছে না?'

আমি তার কথার জবাব দিলাম না। পাগলও আর কিছু বললো না। এরমধ্যে বাড়ির ভেতর থেকে একটা মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে এলো। খালি গলায় গান করছে মেয়েটি, পুরোনো দিনের বাংলা একটা গান, 'এই পৃথিবীর পরে, কতো ফুল ফোটে আর ঝরে...'। ঝুমঝুম শব্দের বৃষ্টিতেও কণ্ঠটা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম। কী যে সুরেলা সেই কণ্ঠ! বৃষ্টি যেন তার আবহসঙ্গীত। বিরক্তিকর বৃষ্টিতে আর তেমন বিরক্তি রইলো না। যেন এমন কিন্নরকন্ঠে গাওয়া গান, জীবনভর মুগ্ধতা নিয়ে শুনা যেতে পারে। পাগলটা আমার এই আচ্ছন্নতাও কীভাবে যেন আঁচ করতে পারলো।

কথা বলে উঠলো সে আবার, 'গান হুনতাছো? হুনো। পুরুষ মানুষ বড় বজ্জাত জাত, মাইয়া দেখলেই যেমন পাগল হয়, তাগো গলার আওয়াজ পাইলেও সমান পাগল হয়। মাইয়া মাইনষের মইধ্যে এমন আছেটা কী, কও?'

আমি যথারীতি নিরব। পাগল বললো, 'আমিও একবার এক মাইয়ার পেরেমে পড়ছিলাম। চান্দের লাহান মাইয়া। দেখলেই চোখ সরবার চায় না, এমনই সুন্দর। তার গল্প কমু, হুনবা?'

আমি শুনার আগ্রহ দেখালাম না। বাড়ির ভেতর থেকে ভেসে আসা গানও আর শুনা যাচ্ছে না। এখন বৃষ্টিটা থামলেই হয়, দ্রুতই ছুটে গিয়ে মিটিংয়ে অংশ নেওয়া যাবে। পাগলটাকেও তার প্রেমের গল্প বলতে খুব একটা আগ্রহী বলে মনে হলো না। বৃষ্টির দিকেই চোখ আটকে আছে তার।

বৃষ্টি থামতেই, তাড়াহুড়া করে রাস্তায় নেমে এলাম। পাগলটা যেমন বসে ছিলো, তেমনই বসে রইলো। রাস্তায় নেমে  কিছুদূর এসে একবার পাগলটার দিকে তাকালাম, সে নিজের মনে কী যেন কী বিড়বিড় করে বলে যাচ্ছে। আমার হঠাৎ কী হয়, আমার কাজের তাড়ার কথা বেমালুম ভুলে গেলাম, পাগলটার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম আবার। বললাম, 'আপনি যে মেয়ের প্রেমে পড়েছিলেন, আপনার প্রেমের সেই গল্প আমি শুনতে চাই। বলবেন?'

পাগলটা শব্দ করে হেসে উঠলো। বললো, 'হুনবা?' বলেই বলা শুরু করলো সে। যেন বলার জন্য তারও আর তর সইছে না।

আমি গভীর আগ্রহ নিয়ে তার প্রেমের গল্প শুনতে লাগলাম। বলতে বলতে তার ঠোঁটের রেখায় হাসি এবং একই সাথে তার চোখের তারায় টলমল অশ্রু দেখে মনে মনে বললাম--আহা, কী যে সুখি একটা মানুষ! এই পৃথিবী ও পৃথিবীর  মানুষের সীমাহীন অস্থিরতার সাথে যার কোনো যোগ নেই!

Comments

Popular Posts