হৃদয়হীনতা
শহিদুল ইসলাম আকাশ
গেলো সপ্তাহে আরো একটি কন্যাশিশুর জন্ম দিয়েছেন রোখসানা। পঞ্চমবারের মতো। এবারও পুত্র হলো না! এর আগের চারটিও কন্যা। এই পর্যায়েও কন্যাই হয়েছে। এতে ভীষণ ভেঙে পড়েছেন রোখসানার স্বামী লোকমান। রোখসানা নিজেও। এই নিয়ে বিয়ের আট বছরের মধ্যে পাঁচটি কন্যাসন্তানকে পৃথিবীর মুখ দেখাতে হলো! শুধু একটি পুত্রসন্তানের আশায় বছর বছর সন্তান জন্মদানের এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন লোকমান-রোখসানা দম্পতি। শুনলাম লোকমান সাহেব নাকি আরেকটা বিয়ের কথা ভাবছেন আজকাল, তাতে যদি বংশের মুখ রক্ষা হয়, অন্তত একটা পুত্র সন্তান হয়!
এটুকু পড়ে আপনারা হয়তো ভাবছেন আমি বানিয়ে বানিয়ে গল্প ফেঁদে বসার পায়তারা করছি আর যার জন্য বেছে নিয়েছি এই পুরোনো কনসেপ্ট। ৫০ বছর আগের ব্যাপার আলাদা, ২০১৯ সালে এসেও এমনটা কেউ করতে পারেন, তা আপনাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য নয় হয়তোবা।
কিন্তু সত্য হচ্ছে এই যে, আমি মোটেও গল্প ফেঁদে বসছি না। ঘটনা সত্যি। এমন ঘটনা, এই আধুনিক যুগেও, আপনার আশেপাশে হরহামেশা চোখে পড়ার কথা। ভালো করে খেয়াল করলেই হয়। লোকমান-রোখসানা দম্পতির মতো এমন আরো অনেক উদাহরণ এই সমাজে এখনো বিরাজমান। যাদের কাছে একমাত্র পুত্রই পারে বংশের মান রাখতে, বংশের প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখতে, বংশের মুখ রক্ষা করতে!
বর্ণিত লোকমান-রোখসানা দম্পতির সাথে আমার কিঞ্চিত যোগাযোগ আছে। দূর-সম্পর্কের আত্মীয়ের মতোই অনেকটা। অনেকবার তাঁদের বুঝিয়েছি। স্বাস্থ্যকর্মী পাঠিয়ে অনেক অনুরোধ করেছি, তাতেও কাজ হয়নি। সন্তান জন্মদানের এই যজ্ঞ ক্ষান্ত দেননি তবু তাঁরা।
যৎসামান্য আয়ের চাকরি করেন লোকমান। পরিবারটি তেমন স্বচ্ছলও নয়। কেবল একটি পুত্রসন্তানের আশায় তবু তাঁর এই ব্যাকুলতা অত্যন্ত বিশ্রী একটি ব্যাপার। কিন্তু কে শোনে কার কথা! আমি সব চেয়ে অবাক হয়েছি, লোকমান সাহেব লেখাপড়া জানা শিক্ষিত মানুষ, তিনি কী করে এমন ভুল করতে পারেন!
গত পরশু এই লোকমান সাহেবের সাথে কথা বলছিলাম। বললাম, 'শুনলাম, আপনি নাকি আবার বিয়ে করতে যাচ্ছেন, প্রথম স্ত্রীর গর্ভে পুত্রসন্তান আসছে না বলে?' তিনি মাথা নেড়ে স্বীকার করলেন তা। বললাম, 'আরেকটা বিয়ে করলেই যে আপনার পুত্রসন্তান হবে, এর কি কোনো নিশ্চয়তা আছে?' তিনি কিছুই বললেন না। তাঁর নিরবতা ভাঙতে অনুরোধ করলাম, বললাম, 'কথা বলুন!'
আমার এমন অনুরোধেও তিনি চুপ করে থাকলেন। আমি ঠিক জানি না, তিনি আমার কথায় সায় দেবেন কিনা, তবু বললাম, 'এবার অন্তত ক্ষান্ত দিন। মেয়েরাও এখন সমাজের সব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। প্রয়োজন শুধু তাদের যোগ্য করে তোলা। সুযোগ দিলে মেয়েরাও পারে বংশের মানমর্যাদা রক্ষা করতে, বংশে প্রদীপ জ্বালানোর জন্য পুত্রের চেয়ে কন্যারও ক্ষমতা কম নয় কিছুই।'
এবার মুখ খুললেন লোকমান সাহেব। বললেন, 'আমি তাহলে এখন কী করবো?' বললাম, 'মেয়েগুলোর দিকে নজর দিন। তাদের মানুষের মতো মানুষ করে তুলুন। নতুন কোনো সন্তান তো নেবেনই না, আরেকটা বিয়ের চিন্তাও মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। শুধু একটি পুত্রসন্তানের আশায় একের পর এক সন্তান জন্ম দিয়ে যে ভুল আপনি করেছেন, মেয়েগুলোকে মানুষের মতো মানুষ করে তার প্রায়শ্চিত্ত আপনাকেই দিতে হবে।'
লোকমান সাহেব আমার অনুরোধ রাখেন কিনা জানি না। রাখা না-রাখা তাঁর নিজের এক্তিয়ার। এ নিয়ে ভাবতেও আর ইচ্ছে করছে না। এই মুহূর্তে আমার ভাবনায় শুধু তাঁর কন্যারাই। মনে মনে ভাবছি, অনেক বছর পরে তাঁরা যখন বড় হয়ে উঠবে, বুঝতে শিখবে, তখন তাঁরা যদি জানে যে, এই পৃথিবীতে তাদের আগমন তাদের নিজেদের অধিকারে হয়নি, তাদের পিতামাতা তাদের বদলে এক একটি পুত্রসন্তানই আশা করেছিলেন__সেদিন, এই পৃথিবী ও পৃথিবীর মানুষের প্রতি সেই কন্যাগুলোর মন কি বিষিয়ে উঠবে না! মানুষের এমন হৃদয়হীনতার স্বরূপ সেদিন কী করে মেনে নেবে তারা!
গেলো সপ্তাহে আরো একটি কন্যাশিশুর জন্ম দিয়েছেন রোখসানা। পঞ্চমবারের মতো। এবারও পুত্র হলো না! এর আগের চারটিও কন্যা। এই পর্যায়েও কন্যাই হয়েছে। এতে ভীষণ ভেঙে পড়েছেন রোখসানার স্বামী লোকমান। রোখসানা নিজেও। এই নিয়ে বিয়ের আট বছরের মধ্যে পাঁচটি কন্যাসন্তানকে পৃথিবীর মুখ দেখাতে হলো! শুধু একটি পুত্রসন্তানের আশায় বছর বছর সন্তান জন্মদানের এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন লোকমান-রোখসানা দম্পতি। শুনলাম লোকমান সাহেব নাকি আরেকটা বিয়ের কথা ভাবছেন আজকাল, তাতে যদি বংশের মুখ রক্ষা হয়, অন্তত একটা পুত্র সন্তান হয়!
এটুকু পড়ে আপনারা হয়তো ভাবছেন আমি বানিয়ে বানিয়ে গল্প ফেঁদে বসার পায়তারা করছি আর যার জন্য বেছে নিয়েছি এই পুরোনো কনসেপ্ট। ৫০ বছর আগের ব্যাপার আলাদা, ২০১৯ সালে এসেও এমনটা কেউ করতে পারেন, তা আপনাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য নয় হয়তোবা।
কিন্তু সত্য হচ্ছে এই যে, আমি মোটেও গল্প ফেঁদে বসছি না। ঘটনা সত্যি। এমন ঘটনা, এই আধুনিক যুগেও, আপনার আশেপাশে হরহামেশা চোখে পড়ার কথা। ভালো করে খেয়াল করলেই হয়। লোকমান-রোখসানা দম্পতির মতো এমন আরো অনেক উদাহরণ এই সমাজে এখনো বিরাজমান। যাদের কাছে একমাত্র পুত্রই পারে বংশের মান রাখতে, বংশের প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখতে, বংশের মুখ রক্ষা করতে!
বর্ণিত লোকমান-রোখসানা দম্পতির সাথে আমার কিঞ্চিত যোগাযোগ আছে। দূর-সম্পর্কের আত্মীয়ের মতোই অনেকটা। অনেকবার তাঁদের বুঝিয়েছি। স্বাস্থ্যকর্মী পাঠিয়ে অনেক অনুরোধ করেছি, তাতেও কাজ হয়নি। সন্তান জন্মদানের এই যজ্ঞ ক্ষান্ত দেননি তবু তাঁরা।
যৎসামান্য আয়ের চাকরি করেন লোকমান। পরিবারটি তেমন স্বচ্ছলও নয়। কেবল একটি পুত্রসন্তানের আশায় তবু তাঁর এই ব্যাকুলতা অত্যন্ত বিশ্রী একটি ব্যাপার। কিন্তু কে শোনে কার কথা! আমি সব চেয়ে অবাক হয়েছি, লোকমান সাহেব লেখাপড়া জানা শিক্ষিত মানুষ, তিনি কী করে এমন ভুল করতে পারেন!
গত পরশু এই লোকমান সাহেবের সাথে কথা বলছিলাম। বললাম, 'শুনলাম, আপনি নাকি আবার বিয়ে করতে যাচ্ছেন, প্রথম স্ত্রীর গর্ভে পুত্রসন্তান আসছে না বলে?' তিনি মাথা নেড়ে স্বীকার করলেন তা। বললাম, 'আরেকটা বিয়ে করলেই যে আপনার পুত্রসন্তান হবে, এর কি কোনো নিশ্চয়তা আছে?' তিনি কিছুই বললেন না। তাঁর নিরবতা ভাঙতে অনুরোধ করলাম, বললাম, 'কথা বলুন!'
আমার এমন অনুরোধেও তিনি চুপ করে থাকলেন। আমি ঠিক জানি না, তিনি আমার কথায় সায় দেবেন কিনা, তবু বললাম, 'এবার অন্তত ক্ষান্ত দিন। মেয়েরাও এখন সমাজের সব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। প্রয়োজন শুধু তাদের যোগ্য করে তোলা। সুযোগ দিলে মেয়েরাও পারে বংশের মানমর্যাদা রক্ষা করতে, বংশে প্রদীপ জ্বালানোর জন্য পুত্রের চেয়ে কন্যারও ক্ষমতা কম নয় কিছুই।'
এবার মুখ খুললেন লোকমান সাহেব। বললেন, 'আমি তাহলে এখন কী করবো?' বললাম, 'মেয়েগুলোর দিকে নজর দিন। তাদের মানুষের মতো মানুষ করে তুলুন। নতুন কোনো সন্তান তো নেবেনই না, আরেকটা বিয়ের চিন্তাও মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। শুধু একটি পুত্রসন্তানের আশায় একের পর এক সন্তান জন্ম দিয়ে যে ভুল আপনি করেছেন, মেয়েগুলোকে মানুষের মতো মানুষ করে তার প্রায়শ্চিত্ত আপনাকেই দিতে হবে।'
লোকমান সাহেব আমার অনুরোধ রাখেন কিনা জানি না। রাখা না-রাখা তাঁর নিজের এক্তিয়ার। এ নিয়ে ভাবতেও আর ইচ্ছে করছে না। এই মুহূর্তে আমার ভাবনায় শুধু তাঁর কন্যারাই। মনে মনে ভাবছি, অনেক বছর পরে তাঁরা যখন বড় হয়ে উঠবে, বুঝতে শিখবে, তখন তাঁরা যদি জানে যে, এই পৃথিবীতে তাদের আগমন তাদের নিজেদের অধিকারে হয়নি, তাদের পিতামাতা তাদের বদলে এক একটি পুত্রসন্তানই আশা করেছিলেন__সেদিন, এই পৃথিবী ও পৃথিবীর মানুষের প্রতি সেই কন্যাগুলোর মন কি বিষিয়ে উঠবে না! মানুষের এমন হৃদয়হীনতার স্বরূপ সেদিন কী করে মেনে নেবে তারা!

Comments
Post a Comment