চোর

শহিদুল ইসলাম আকাশ


চোর ধরা পড়েছে। মাত্র ঘুমটা লেগে এসেছে, এমন সময় আমার ডাক পড়লো। সাত বছর আগের কথা, তখন প্রথমবার জনপ্রতিনিধি হিসেবে শপথগ্রহণ করেছি মাত্রই।

মধ্যরাতে ছুটে যেতে হলো। গিয়ে দেখি, ধরা পড়া চোরকে ঘিরে আছে অসংখ্য মানুষ। চোরের উপর সমবেত জনতার কিল ঘুষি সমানে চলছে, সজোরে লাথিও দিয়ে যাচ্ছে কেউ কেউ। মার খেয়ে চোরের প্রায় আধমরা অবস্থা।

আমি সবাইকে থামতে বললাম। কিন্তু কে শুনে কার কথা! শেষে চিৎকার করে উঠতে হলো আমাকে, 'মরে গেলে সবাই মার্ডার কেসের আসামী হবেন, বলে দিলাম।' চিৎকারে কাজ হলো, মারধর থামলো।

ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে গেলাম। মার খেয়ে চোরটার চোখের নিচে কালো হয়ে গেছে। নাক ও মুখে ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরছে। আমি দ্রুত একজন ডাক্তারকে খবর পাঠালাম। উপস্থিত সবাই একজন আরেকজনের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলো। একজন তো বলেই বসলো, 'চোরের জন্য কেমন দরদ! ফুঁ!'

আমি তার কথার জবাব দিলাম। বললাম, 'যে কোনো অপরাধীর জন্য দেশে প্রচলিত আইন আছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কারো জন্যই সমীচীন নয়।'

ডাক্তার এসে তাঁর সামর্থ্যানুযায়ী চিকিৎসা দিলেন। বললেন, 'রোগীর অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। এখনই মেডিকেলে ভর্তি করাতে হবে। না-হলে কিছু একটা হয়ে যেতে পারে।'

ডাক্তারের কথা শুনে মুহূর্তেই ভিড় কমে এলো, একে একে সরে যেতে লাগলো সবাই। আমি পুলিশে খবর দিলাম। পুলিশ এসে চোরটাকে নিয়ে গেলো দ্রুত। পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার আগে পুলিশের কাছে অনুরোধ করলাম, তাকে যেন আগে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হয়।

এরপর সেই চোরের আর কোনো খবরাখবর পাইনি বা রাখিনি। রাখার প্রয়োজনও বোধ করিনি। একটা চোর ধরা পড়েছে, তাকে গণধোলাইয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা গেছে--এতেই বাঁচা গেলো।

গত মাসের কথা। আমার বাসার সামনে একটি সিএনজি অটোরিকশা এসে থামলো। গাড়ি থেকে চল্লিশের কাছাকাছি বয়সের এক পুরুষ দ্রুত নেমে এসে আমার পা ছুঁয়ে সালাম করতে চাইলো। আমি বাধা দিলাম। নিজের থেকে বয়সে বড় কেউ পা ছুঁয়ে সালাম করলে বিব্রত না-হয়ে পারা যায় না। বোরকাপরা একজন নারী ও কোলে পুতুলের মতো সুন্দর বছর চারেক বয়সের একটা বাচ্চামেয়েও আছে।

মানুষটাকে আমি চিনতে পারলাম না। জানতে চাওয়ার আগে সে নিজেই নিজের পরিচয় দিলো, 'সাত বৎসর আগে আপনের এলাকায় চুরি কইরা ধরা পড়ছিলাম একবার। সবাই সে কী মার মারলো আমারে! আপনে ঠিক সময়ে না আইলে মইরাই গেছিলাম। এখন মনে পড়ছে আমারে?'

আমি উপর-নিচ মাথা নাড়লাম শুধু। মুখে বলার ভাষা ছিলো না যে, 'হ্যাঁ চিনেছি।' সে বললো, 'সেবার ছয় মাসের মতো জেল খাটছিলাম। জেল থেকে বাইর হইয়া আর চুরিচামারি করি নাই। কিছুদিন চাকরিবাকরি করছি, এখন ব্যবসাপাতি করি। দোকান দিছি একটা। বিক্রিবাট্টা মন্দ না দোকানের।'

আমি তাদের বাসার ভেতরে এনে বসতে দিলাম। সে বললো, 'জেল থাইকা বাইর হইয়াই শাদী করছি।' বলেই, তার পাশে বসা স্ত্রী ও সন্তানের দিকে তাকালো। আমিও একপলক তাকালাম তাদের দিকে।

বললো, 'আপনে একদিন আমার জীবনটা বাঁচাইছিলেন। সেই কথা ভুলি নাই। তাই আপনের লগে একবার দেখা করতে আইলাম।'

আমি কী বলবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। মনে মনে শুধু সে, তার স্ত্রী ও পুতুলের মতো বাচ্চামেয়েটার জন্য শুভকামনা করলাম। জীবন তার মঙ্গলময় হাত তাদের দিকে বাড়িয়ে দিক।

Comments

Popular Posts