পৃথিবীর শেষ সীমান্তে

শহিদুল ইসলাম আকাশ

একটা যুবক এগিয়ে এলো সামনে। পঁচিশ বা ছাব্বিশের মতো বয়স হবে তার। সালাম দিলো। ছেলেটাকে চিনলাম না। আগে কখনো দেখেছি বলে মনে পড়ছে না। এসেছি একটা অনুষ্ঠানে, স্বেচ্ছাসেবী এক সংগঠনের বাল্যবিবাহ রোধকল্পে করণীয় বিষয়ক সেমিনারে। সেখানে এই যুবকও আলোচক হিসেবে আছে।

ছেলেটা আমাকে বললো, 'আপনাকে আমি চিনি। আপনার লেখা নিয়মিত না-হলেও মাঝেমধ্যে পড়ি।' আমি ধন্যবাদ জানালাম। সে বললো, তার নাম মিজান। সেমিনার শেষে আমার কাছে সামান্য সময় চায় এবং সে কী একটা গল্প বলবে, আমি যদি সেই গল্পটা কখনো লিখতে পারি। এমন কথায় বিব্রত হলেও, বললাম, 'হ্যাঁ অবশ্যই।'

সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষে মিজান ছেলেটার সাথে একান্তে বসলাম। বলতে বললাম, কী সেই গল্প বলার আছে তার।

মিজান গল্প বলা শুরু করলো। কোনো এক ঊর্মি নাম্নী তরুণীর সাথে তার প্রণয়ের গল্প। বললো, চার বছরের সম্পর্ক। দুই পরিবার কিছুতেই মেনে নিচ্ছিলো না, দু'জনেই সিদ্ধান্ত নেয় কাজী অফিসে গিয়ে বিয়ের কাজটা সেরে ফেলবে। 

সেই অনুযায়ী দিনক্ষণ ঠিক করা হলো। এক মঙ্গলবার সকাল এগারোটায় ঊর্মি কলেজের সামনে অপেক্ষা করবে। মিজান সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে আসবে। তারপর দু'জন একসাথে সোজা কাজী অফিস। আগেররাতে ফোনে সব ঠিকঠাক করে রাখা হয়।

কিন্তু সকাল এগারোটায় কলেজের সামনে এসে মিজান দেখে, ঊর্মি আসেনি। একটু পরপর ফোন করতে লাগলো ঊর্মিকে, ঊর্মি ফোন ধরে না। চরম বিরক্তি নিয়ে সেদিন বিকেল চারটা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকে মিজান। ঊর্মি না আসাতে ফিরে যায় সে। রাতেও অনবরত ফোন করে ঊর্মিকে পাওয়া যায়নি। নিদ্রাহীন সারারাত জেগেই থাকলো মিজান। ঊর্মির কোনো সমস্যাটমস্যা হয়নি তো! ঊর্মির জন্য উৎকণ্ঠাও হচ্ছিলো তার। 

পরদিন সকালে মিজান কলেজে গেলে দেখে ঊর্মিও এসেছে কলেজে। দেখা হতেই ঊর্মির মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকতা দেখলো না মিজান। যেন গতকাল কোনো কিছুই হয়নি এমনকি কাজী অফিসে যাবার কোনো কথাও ছিলো না। অভিমানে মিজানও এই ব্যাপারে কিছু বললো না আর।

মিজানের মুখ থেকে এসব শুনে আমার তেমন কোনো আগ্রহ হলো না, পরবর্তী ঘটনা জানার। পুরোনো কনসেপ্ট। বাংলাসাহিত্যে এই প্লটে হাজারেরও বেশি গল্প লেখা হয়েছে। তবু আমি তীব্র কৌতূহলের ভঙ্গিতে বললাম, 'ঊর্মির সাথে কি শেষ পর্যন্ত বিয়ে হয়েছিলো?'

রহস্যময় হাসি হাসলো মিজান। বললো, 'বাকিটা আপনি কল্পনায় সাজিয়ে নেবেন। অবশ্য এই নিয়ে লিখেন যদিবা কিছু, কখনো।' বলে স্মার্টফোনের গ্যালারি থেকে ঊর্মির কিছু ছবি দেখালো আমাকে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, অসম্ভব সুন্দরী বলতে যা বোঝায়, নির্দ্বিধায় তা বলা যায় ঊর্মি মেয়েটাকে। এতোটাই যে, এমন সুন্দরের কাছে দাঁড়ালে নিজেকে খুব তুচ্ছ মনে হওয়ার মতো ব্যাপার। মিজান পুনর্বার জানতে চাইলো, 'লিখবেন তো?'

আমি হাসলাম। বললাম, 'হয়তো।' 

এরপর কেটে গেছে তিন বছর। মিজানের ফোন নাম্বার আমার কাছে ছিলো না, হয়তো আমার নাম্বারটাও ছিলো না মিজানের। না থাকলেও ফোন নাম্বার জোগাড় করা এমন কঠিনও কিছু ছিলো না। প্রয়োজন ছিলো না তাই জোগাড় করিনি, তেমনি মিজানেরও এই ব্যাপারে আর আগ্রহ ছিলো না হয়তো। থাকলে সেই-ই ঠিক ফোন নাম্বার জোগাড় করে নিতো।

তিন বছরে এই ব্যাপারটাও আমি ভুলে গেছি প্রায়। ক'দিন আগে আবার মিজানের সাথে দেখা হলো হঠাৎ। দেখা হতেই মনে পড়লো আবার। এবার দেখেই চিনলাম। এক মার্কেটে দেখা। পরস্পর পরস্পরের কুশল জানতে চাইলাম। অনেকক্ষণ কথা হলো ঠিকই, কিন্তু একবারও ঊর্মির প্রসঙ্গ তুললো না সে। আমিই একটু অন্যভাবে ঊর্মির প্রসঙ্গ আনতে চাইলাম, বললাম, 'আর কেউ সাথে নেই? না মানে আমার গাড়ি আছে, কোথাও যাবার থাকলে আমি নামিয়ে দিতে পারি।'

মিজান বললো, 'আমার স্ত্রী ঊর্মি আছে সাথে। পাশের কসমেটিকসের দোকানে কেনাকাটা করছে সে। এক্ষুণি এসে যাবে।' বলেই, 'ঊর্মি ঊর্মি' করে ডাকলো মিজান। এরপর আমার অবাক হওয়ার পালা। ঊর্মি নামের যে মেয়েটা এসে মিজানের বাহু ধরে বললো, 'হ্যাঁ চলো', এই ঊর্মি সেই ঊর্মি না। ঘটনা কী!

আমার বিহ্বল দৃষ্টি মিজানের চোখ এড়ালো না। স্মিত হেসে বললো, 'পরিচয় করে দিই, এ আমার স্ত্রী। ওর নাম অবশ্য, ঊর্মি না, মুন্নি। আমি তাকে ঊর্মি নামেই ডাকি। সেও আপত্তি করে না। ভালোবাসায় আপত্তি থাকতেও নেই, কী বলেন!


বলেই, মিজান 'এখন যেতে হচ্ছে, যাই' বলে ঊর্মি ওরফে মুন্নির হাত ধরে চলে যেতে লাগলো। পিছন থেকে দেখে মনে হলো, এই মেয়েটার হাত ধরেও পৃথিবীর শেষ সীমান্তে যেতে পারবে মিজান। একটুও ক্লান্তি হবে না তার--কখনো, কখনোই।

Comments

Popular Posts