ফুল ফোটে

শহিদুল ইসলাম আকাশ 

এক রাজকুমার প্রেমে পড়েছেন। প্রেমিকা কোনো রাজকুমারী নয়, অতি সাধারণ এক নারী। সেই নারীর লোধ্রফুল খুব প্রিয়। রাজকুমার তার কাছে প্রেম নিবেদন করলে নারীটি বললেন, 'আপনার নিজের বাগানের লোধ্রফুল দিতে পারবেন?' 

হেসে উঠলেন রাজকুমার, 'লোধ্রফুল! সারা জাহানের সব লোধ্রফুল তোমার পায়ের কাছে এনে ফেলতে পারি আমি।' নারীটিও হাসলেন, বললেন, 'সারা জাহানের লোধ্র আমি চাই না। আপনি নিজে বাগান করবেন, বাগানটায় যেদিন লোধ্র ফুটবে, সেদিন আমি আপনার আহবানে সাড়া দেবো।'

প্রেমে মাতোয়ারা রাজকুমার ঠিক করলেন প্রেমিকার শখের ফুল এই লোধ্রফুলের একটা বাগান করবেন তিনি। সেই বাগানের লোধ্রফুলের সব রেণু প্রেমিকাকে উপহার দেবেন আর বলবেন, 'তোমার জন্য, প্রিয়তমা।'

রাজকুমার বাগান করলেন, কিন্তু বাগানের একটি চারাও বেঁচে উঠছে না জমিতে। এই জমি কি লোধ্রফুলের উপযুক্ত না, নাকি এতে ব্যবহৃত সার উপযোগী না--এর জবাব কেউ দিতে পারছিলো না।

তিনি চাষের জন্য অন্য জমি নির্বাচন করলেন, তাতেও কাজ হলো না। লোধ্রের চারা বাঁচছেই না। আবার নতুন জমি, নতুন নতুন ধরনের সার--কিন্তু না, কিছুতেই কাজ হয় না কিছুই। এক পর্যায়ে ভিনদেশ থেকে লোধ্র বিশেষজ্ঞ আনা হলো, কিন্তু তাতেও অবস্থার পরিবর্তন হয় না, তিনিও শত চেষ্টায় একটি চারাও বাঁচাতে পারলেন না।

লোধ্রের বাগানের নেশায় রাজকুমার ইতিমধ্যেই তার ধনসম্পদের অনেকখানি নষ্ট করে ফেললেন। রাজকুমারের এই দিশেহারা অবস্থা দেখে কলমচি বললেন, 'রাজকুমার, লোধ্রফুল বাইরে থেকে কিনে আনলে হয় না? যদি অনুমতি দেন আমি কয়েকশ টন লোধ্র আমদানি করে আনতে পারি।' রাজকুমার শুনে রেগে গেলেন, বললেন, 'আমি আমার নিজের বাগানের লোধ্র আমার প্রেয়সীকে দিতে চাই, সেও তাই চায়। সুতরাং নিজের বাগান থেকেই লোধ্রফুল ফুটাতে চাই আমি।'

উৎকণ্ঠিত কলমচি বললেন, 'কিন্তু লোধ্রের পেছনেই সাম্রাজ্যের অর্ধেক নিঃশেষ হয়েছে রাজকুমার। এদিকটাও ভেবে দেখা প্রয়োজন নয় কি?'

উতলা রাজকুমার বললেন, 'হয়েছে হোক। প্রয়োজনে আমার সাম্রাজ্যের সবকিছুই নিঃশেষ হবে তো হোক, তবু আমি লোধ্রের বাগান করবোই এবং তাতে ফুল ফুটাবোই।'

রাজকুমারের লোধ্রের বাগানের নেশায় সমস্ত সাম্রাজ্য উজাড় হলো, তবু নিজের বাগানে লোধ্রফুল ফুটাতে পারলেন না তিনি। নিঃস্ব, অসহায় রাজকুমার ভিখিরির মতো তাঁর সেই প্রিয়তমা নারীর সামনে নতজানু হয়ে দাঁড়ালেন একদিন, বললেন, 'আমার সমস্ত সাম্রাজ্যের বিনিময়েও আমি একটি লোধ্র ফুটাতে পারলাম না। আমাকে তুমি ক্ষমা করো।' 

সেই নারী রাজকুমারকে প্রত্যাখ্যান করলেন না, বললেন, 'লোধ্রফুল আমার প্রিয় ঠিক, কিন্তু শুধুমাত্র প্রেমিকার পছন্দের সামান্য ফুলের জন্য নিজের সাম্রাজ্য পর্যন্ত উজাড় করে দিতে পারে যে প্রেমিক--সেই প্রেমিককে উপেক্ষা করার মতো ক্ষমতা এই জাহানের কোনো প্রেমিকারই কি আছে?' বলেই, এগিয়ে গিয়ে রাজকুমারের হাত ধরলেন নারীটি। বললেন, 'আমি আপনাকে গ্রহণ করলাম রাজকুমার। আমাকেও আপনি গ্রহণ করে নিন।'

প্রেমিকাকে পেয়ে তাঁর বিশাল সাম্রাজ্য হারানোর শোক ভুলে গেলেন রাজকুমার, যেন তাঁর এই প্রিয়তমা নারীটিই তাঁর আসল সাম্রাজ্য। তিনি প্রেমিকাকে বিয়ে করলেন এবং নতুন জীবন শুরু করলেন। 

নিঃস্ব, দীন রাজকুমার তাঁর ঝুপড়ি ঘরের সামনে এক চিলতে খালি জায়গায় কিছু লোধ্রফুলের চারা লাগালেন আবার। প্রিয়তমা স্ত্রীকে নিয়ে সকালসন্ধ্যা সেই চারাগুলো পরিচর্যা করতে লাগলেন। পরিচর্যা বলতে দুইবেলা পানি দেওয়া, চারার গোড়ায় মাটি নেড়ে দেওয়া, এই। বিশেষজ্ঞ আনা তো দূরের কথা, চারাগুলোয় কোনোরকম সার দেবেন, সেই সামর্থ্যটুকুও নেই এখন আর। অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, এক সকালে তাঁরা দু'জনেই দেখেন সেই লোধ্রগাছে অসংখ্য ফুল ফোটে আছে। কী যে আশ্চর্যরকম সুন্দর সেই ফুল!

পুনশ্চ:
প্রাগৈতিহাসিক যুগের গল্প লিখতে আমি খুব পছন্দ করি। কল্পনায় আমি সেই সময়ের রাজামহারাজা ও রানীমহারানীদের ছবি আঁকি মাঝেমাঝে এবং তা লিখে ফেলি। এই লেখাও তেমনই একটি লেখা। 

লেখায় পুনশ্চ যখন লিখলামই তখন প্রাসঙ্গিক ভেবে এই কথাটাও বলে নিতে চাই যে, টাকা দিয়ে বা টাকার জোরে এই জগতে অনেককিছু কেনা যায়, নিজের করে পাওয়া যায় ঠিক, কিন্তু সবকিছুই কি? উঁহু, সবকিছু কখনোই না।

টাকার লোভে এই জগতে একটি ফুলও ফোটে না। ফুল ফোটে তার নিজের খুশিতেই, নিজেরই সময়ে।   

Comments

Popular Posts