গভীর গোপন
শহিদুল ইসলাম আকাশ
আসাদ স্যার জায়গির থাকতেন। নাজমা আপাদের ঘরের সামনে ছোটখাটো একটা চিলেকোঠা ছিলো, সেখানে থেকে তিনি একটা স্কুলে শিক্ষকতা করতেন আর নাজমা আপা ও তাঁর এক ভাই ও ছোট এক বোনসহ আমরা কয়েকজন প্রতিবেশী ছাত্রছাত্রীকে সন্ধ্যার পর পড়াতেন।
আসাদ স্যার তখন টগবগে তরুণ। অবিবাহিত ছিলেন। সুঠাম স্বাস্থ্য, দীর্ঘদেহ, সিনেমার নায়কদেরও হার মানাবার মতো চেহারা তাঁর।
নাজমা আপা তখন ক্লাস টেনে, আমরা বাকিরা সবাই তখন ফাইভ সিক্সে পড়ি। ক্লাস টেনে পড়লে কী হবে, নাজমা আপাকে তখন অনেক বড় দেখাতো--যেন কলেজেটলেজে পড়ে। দেখতে নাজমা আপাও ছিলো পরীর মতো সুন্দর।
আসাদ স্যার আমাকে খুব স্নেহ করতেন। খেয়াল করতাম, নাজমা আপার প্রতিও তাঁর এক ধরণের প্রশ্রয় ছিলো। নাজমা আপা কখনো পড়া না-শিখলে তার প্রতি নির্দয় আচরণ করতেন না--অন্যরা পড়া না-শিখলে যেমন স্যারের হাতের বেত কথা বলতো যখনতখন। নাজমা আপাও স্যারের দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাতো, মুখে হাসি, চোখের তারায় কী এক অজানা কথা যেন ভেসে ভেসে বেড়ায়। নাজমা আপা কি স্যারের প্রেমে পড়েছে কিংবা স্যার নাজমা আপার? আমরা ছোট বাচ্চা, আমাদের এইসব ভাবার কোনো মানে হয় না। তবু ভাবতাম।
অন্যদিকে নাজমা আপা প্রায়ই তাঁর একই ক্লাসের এক ছেলের কথা বলতো, দেখতে নাকি ছেলেটা রাজপুত্রের মতো। সেই ছেলে নাকি নাজমা আপার বইয়ের ভেতর ফুলের পাপড়ি গুঁজে দেয়, সাদা পাতায় কী সব লিখে নাজমা আপার দিকে ছুঁড়ে দেয়। নাজমা আপা যখন ছেলেটার কথা বলে, তখন নাজমা আপাকে কেমন যেন অন্যরকম মনে হতো। ঘটনা কী কে জানে!
একদিন নাজমা আপার কাছে জানতে চাইলাম, 'তুমি কি কাউকে পছন্দ করো? কাকে করো--আসাদ স্যারকে নাকি সেই ছেলেটাকে, যে তোমার ক্লাসে পড়ে, তোমার বইয়ের ভেতর ফুলের পাঁপড়ি রাখে, চিঠি লিখে তোমার দিকে ছুঁড়ে দেয়...?'
নাজমা আপা হাসলো, রাগ করেছে এমন অভিনয় করে বললো, 'তুই পিচ্ছি পুলা, তোর এসব জেনে লাভ কী? মাথায় ডাণ্ডা দিয়ে এক বাড়ি দেবো, বুঝলি?'
নাজমা আপার কাছে এরপর অনেকবারই এই প্রশ্নটা করেছি, নাজমা আপা রহস্যময় হাসি দিয়ে এড়িয়ে গেছে প্রতিবার। তবু এই রহস্য ভেদের দুর্নিবার আগ্রহ আমার ভেতর ক্রমশ ডালপালা গজাতেই লাগলো।
পরের বছর নাজমা আপা এসএসসি পরীক্ষা দিলো। দুই বিষয়ে লেটার নিয়ে ফার্স্ট ডিভিশনে পাস করে সে। আসাদ স্যার সে কী খুশি! এতোটা খুশি নাজমা আপাকেও মনে হয়নি।
এরপর নাজমা আপা কলেজে ভর্তি হলো। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর যুক্ত হলো নতুন নতুন গল্প। কোন দিন কোন ছেলে তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকেছে, কোন ছেলে তাকে নিয়ে কবিতা লিখেছে, কে প্রতিদিন আসাযাওয়ার পথে তার জন্য দাঁড়িয়ে থেকেছে। আমি নাজমা আপার প্রতিটা কথা মন দিয়ে শুনি আর তার কাছে জানতে চাই সেই প্রশ্নটাই--'তুমি কি কাউকে পছন্দ করো, আপা?'
নাজমা আপার সেই চিরচেনা রহস্যময় হাসি। নাজমা আপা বলে না কিছুই, আমারও জানা হয় না আর--সে কি আদৌ কাউকে মনে মনে চায়!
নাজমা আপার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা চলাকালীন সময় একদিন শুনি আসাদ স্যারের ভিসা এসেছে, তিনি দুবাই চলে যাবেন। দুবাইতে স্যারের এক ভাই থাকেন, তিনিই স্যারের যাওয়ার যাবতীয় ব্যবস্থা করেছেন।
খবরটা শুনার পরও, নাজমা আপার কোনো ভাবান্তর দেখলাম না। আমি স্যারের এই প্রসঙ্গটা তুলতেই নাজমা আপা হেসে বললো, 'স্যার বিদেশ যাবে এটা নিয়ে এতো ভাবনার কী? এই দেশ স্যারের আর ভালো লাগছে না হয়তো।'
স্যার যেদিন সকালে চলে যাবেন তার আগের দিনে সন্ধ্যায়ও স্যারের কাছে পড়তে গেছি আমরা। তিনি আমাদের অনেক উপদেশ দিলেন। ঘুরেফিরে ওই এক কথাই যদিও, পড়ালেখা যেন ভালোভাবে করি সবাই।
একসময় সবাইকে স্যার বিদায় দিলেন, শুধু আমি আর নাজমা আপাকে আরেকটু বসতে বললেন। অনেকক্ষণ আমরা বসে রইলাম, কারো মুখে কোনো কথা নেই। পিনপতন নিরবতা। নাজমা আপা আমার দিকে তাকিয়ে বললো, 'তুই একটু বাইরে দাঁড়া। স্যারের সাথে আমার সামান্য কথা আছে।'
আমি ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ালাম। প্রায় মিনিট দশেক পর নাজমা আপা এলো। এসেই বললো, 'চল।' এই দশ মিনিট স্যারের সাথে কী কথা হলো, জিজ্ঞেস করলাম। নাজমা আপার মুখে হাসি, বললো, 'তেমন কিছু না। বলেছি তিনি আমাদের খুব ভালো একজন শিক্ষক ছিলেন।' তারপর আমার কান টেনে ধরে বললো, 'তুই তো ভালোই, তুই কি ভেবেছিস আমি স্যারের প্রেমে পাগল হয়ে গেছি। একজন লজিং মাস্টারের প্রেমে পড়ার মতো বোকা নাজমা না, বুঝলি?'
এরপর দুইটি বছর কেটে গেলো। আসাদ স্যারের কোনো খবরাখবর পাই না। তিনি বিদেশে কেমন আছেন কী জানি! তখন তো এখনকার মতো ফোন এতো সহজলভ্য হয়নি। চিঠি অবশ্য দিতে পারতেন তিনি, তাও দেননি। নাজমা আপাকে কখনো স্যারের ব্যাপারে উৎসাহী মনে হয়নি, স্যারের কথা উঠলে সে ঠাট্টা করে বলতো, 'ওইসব দেশে নাকি সবই পাওয়া যায়, মেয়েমানুষ তো একদম সস্তা। দেখ হয়তো একেকদিন একেক মেয়ে নিয়ে ফুর্তি করে বেড়াচ্ছে।'
একটা সময় নাজমা আপার বিয়ে ঠিক হয়ে গেলো। বর ছেলেটাও দেখতে মন্দ নয়, এক্সপোর্ট ও ইমপোর্টের ব্যবসাটেবসা করে এলাহি কাণ্ড নাকি করে ফেলেছেন অল্প বয়সে।
নাজমা আপার বিয়ের মাত্র তিন দিন আগে আমার কাছে একটা চিঠি এসে পৌঁছে, হঠাৎ। খাম খুলতেই খামের ভেতর দেখি আরো একটা খাম। খামের উপর লেখা, এই চিঠি নাজমাকে দিও।
অতি উৎসাহী আমি সেই খামও খুলে পড়তে লাগলাম। স্যার লিখেছেন--
নাজমা,
কেমন আছো তুমি? আমার কথা থাক। আমি বিদেশে আসার আগের রাতের কথা মনে পড়ে এখনো, তুমি এমন করে কেঁদেছিলে যে, সে কান্না এখনো আমার কানে লেগে আছে। আমাকে ভালোবেসেছো, অথচ কখনো কাউকে বুঝতে দাওনি। সেদিন রাতেইবা কেন এমন করে জানান দিতে গেলে--যখন আমার কিছুই করার নেই!...'
চিঠিটা পড়ে আমি আমি শিউরে উঠলাম। নাজমা আপা তাহলে...! তিন দিন পরেই নাজমা আপার বিয়ে, এমন সময়ে এই চিঠি নাজমা আপাকে দেওয়া কি উচিত হবে? চিঠিটা পড়েই আমি ছিঁড়ে ফেললাম। ন্যায় বা অন্যায়ের ধার ধারিনি।
বিয়ের দিন নাজমা আপাকে রাজকন্যার মতো লাগছিলো। বেনারসি শাড়িতে তাকে দেখে মনে হচ্ছিলো, এই পৃথিবীর ধুলোমলিন মাটি যেন নাজমা আপার জন্য না। অন্য কোনো গ্রহ থেকে যেন মাত্র কিছুদিনের জন্য পৃথিবীতে আসা।
আমি নাজমা আপার পাশে গিয়ে বসলাম, বললাম, 'আসাদ স্যারের কথা মনে আছে তোমার? স্যারের কথা কেন জানি খুব মনে পড়ছে আজ।'
আমি দেখলাম, নাজমা আপার দু'টি চোখ হঠাৎ অশ্রুসিক্ত হয়ে গেলো। মুহূর্তেই গাল বেয়ে পড়তে লাগলো। আমার খুব ইচ্ছে হলো, হাত বাড়িয়ে আমি নাজমা আপার চোখের সেই অশ্রু মুছে দিই।

Comments
Post a Comment