পরের জায়গা পরের জমি


শহিদুল ইসলাম আকাশ

জায়গাজমির সার্ভেয়ার তিনি। সুদীর্ঘ ত্রিশ বছর ধরে এই পেশার সাথে যুক্ত আছেন। বয়স ষাটের অধিক পেরিয়েছেন বটে, শরীরে বয়সের সেই ছাপ নেই। চোখে পাওয়ারের চশমাটা যা একটু বয়স জানান দিতে চেষ্টা করে, এই যা।

প্রায়ই তাঁর কাছে যাই, জমিজমার নানান পরামর্শের জন্য। বিজ্ঞ সার্ভেয়ার, যুক্তিও অকাট্য। ভালো লাগে তাঁকে। এই পেশায় তাঁর সাফল্যও অনেক--কী অর্থনৈতিক, কী সামাজিক।

আজ তাঁর কাছে এসেছি একটা বিষয় নিয়ে আলাপ করতে। তাঁকে কেমন জানি অন্য রকম মনে হলো। তিনি কী মনে করে যেন আমাকে বলে বসলেন, 'দলিলদস্তাবেজ ও সিট-খতিয়ানে বন্দী এই যে জীবন--এই জীবন মাঝেমাঝে একদম ভালো লাগে না। বিরক্তি ধরে যায়।'

আমি তাঁর এমন কথায় খুব একটা অবাক হইনি। অনেক গৃহী মানুষও হঠাৎ সন্ন্যাসী হতে চায়। আবার অনেক সন্ন্যাসীরও হঠাৎ গৃহী হওয়ার সুতীব্র ইচ্ছা মনে জাগে। এক পুরোহিতের কথা জানি, যিনি হঠাৎ একদিন এক তন্বী তরুণীর কবোষ্ণ বুকে মুখ গুঁজে বলে উঠেছিলেন, 'জীবন এটাই।' এতে নিশ্চয় দোষ দেওয়া যায় না। আমার জীবনটা তো আমারই, নাকি?

অবাক না-হলেও, তবু জানতে চাইলাম তাঁর কাছে, 'কেন ভালো লাগে না?'

তিনি চোখ থেকে চশমাটা খুলে টেবিলে রাখতে রাখতে বললেন, 'আমরা দলিল দিয়ে, খতিয়ানের দাগ মিলিয়ে, সিটের নিরিখের মাধ্যমে মালিকানা নির্ণয় করি, এই নির্ণয় কি আসলে ঠিক?'

বললাম, 'নয় তো কী! জায়গাজমির বিষয় তো আবেগনির্ভর নয়, তার জন্য সঠিক কাগজপত্রাদি লাগে। যার কাগজপত্র সঠিক, আসল মালিক তো সেই-ই। এতে ভুলটাইবা কোথায়?'

তিনি হাসলেন। আমার দিকে ঈষৎ ঝুঁকে এসে বললেন, 'মালিক? উঁহু। সিট, খতিয়ান ও দলিলের একদলা কাগজ দিয়ে জমিতে মানুষ তার নিজের মালিকানা জাহিরের চেষ্টা করলেই, তা যথাযথ হলেও, মালিক কি হওয়া যায়? মানুষ কী নির্বোধ দেখো--তাতেই ভাবে যে, মালিক হওয়া গেলো!'

'নির্বোধ বলছেন কেন?' আমার প্রশ্ন।

তিনি বললেন, 'নির্বোধ নয় তো কী? কারণ মানুষকে মূলত কোনো কিছুরই মালিকানা দেওয়া হয়নি--জীবনের মতো, জীবনের অন্য সকল কিছুর মতো, জমিজমারও। সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আসল মালিক তো ওই একজনই--যিনি কখনো কাছে তো কখনো দূরে বসে আমাদের নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। অথচ এই সত্য জেনেও, দলিল দিয়ে, খতিয়ান দিয়ে, সিটে স্কেল ফেলে, খুঁটি দিয়ে, বাউণ্ডারি ওয়াল বা ঘর নির্মাণ করে নিজেকে মালিক বানাবার সে কী হাস্যকর চেষ্টা মানুষের, সৃষ্টির আদিকাল থেকেই! কোনো মানে হয়!'

এই পর্যায়ে এসে তাঁর কথায় সম্মতি জানাতে হলো আমাকে, বললাম, 'মানে নেই। মানে খুঁজার তাগিদও নেই কারো। আমাদের মেকী মালিকানা দেখে, মালিকানা জাহিরে আমাদের বিরামহীন প্রতিযোগিতা দেখে--আসল মালিক আড়ালে নিশ্চয় তাচ্ছিল্যে হাসেন। আহা, সৃষ্টির সেরা জীব!'

পুনশ্চ:
আব্দুল আলীমের বিখ্যাত সেই গান মনে পড়ে গেলো--

'পরের জায়গা পরের জমি
ঘর বানাইয়া আমি রই
আমি তো এই ঘরের মালিক নই।...'

Comments

Popular Posts